সোমবার ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬

ফ্রান্সের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার নেপথ্যে

গাজায় মানবিক সংকট ঘনীভূত হওয়া ও পশ্চিমা বিশ্বে চলমান অচলাবস্থা দূর করার তাগিদেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ফিলিস্তিনিকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী সেপ্টেম্বরেই জাতিসংঘে এই স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে প্যারিস জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত কূটনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে ম্যাক্রোঁর এই পদক্ষেপ আকস্মিক ছিল না। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

এপ্রিল মাসে মিসরের আল-আরিশ শহরে গাজা সীমান্তে সফরের সময় তিনি সরেজমিনে সংকট দেখেন। ফিরেই তিনি জানান, ফ্রান্স শিগগির ফিলিস্তিনিকে স্বীকৃতি দেবে।

এরপর সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিতভাবে একটি পরিকল্পনা করেন ম্যাক্রোঁ। যাতে ফ্রান্স ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও কানাডা একযোগে স্বীকৃতি দেয়। আরব রাষ্ট্রগুলোকে ইসরায়েলের প্রতি কিছুটা নমনীয় করতে জাতিসংঘে সম্মেলনের পরিকল্পনাও ছিল। তবে কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর যুক্তরাজ্য ও কানাডা সরে দাঁড়ায়। তিনজন কূটনীতিক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের রোষ এড়াতে তারা এতে অংশ নেননি।

ফরাসি এক কূটনীতিক বলেন,স্পষ্ট হয়ে গেলো, সঙ্গীদের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ আর নেই।

ফ্রান্সের ভেতরেও গাজা থেকে আসা ভয়াবহ ছবি ও মৃত্যুমিছিল ম্যাক্রোঁকে চাপে ফেলে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় মুসলিম ও ইহুদি জনসংখ্যার দেশে ভারসাম্য রক্ষা করাও তার জন্য ছিল কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই ঘোষণার কঠোর সমালোচনা করেছে। তারা একে হামাসের জন্য ‘পুরস্কার’ হিসেবে দেখছে। হামাস ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর থেকেই চলমান যুদ্ধ চলছে।

ম্যাক্রোঁ এই বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আগেই আলোচনা করেছেন। ট্রাম্প শুক্রবার বলেছেন, এই সিদ্ধান্তের বিশেষ কোনও গুরুত্ব নেই। তবে তিনি ম্যাক্রোঁকে ‘ভালো লোক’ বলেও উল্লেখ করেন।

আগামী সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকের ফাঁকে রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজন করবে ফ্রান্স। সেখানেই স্বীকৃতি ঘোষণা করা হবে। এর আগে এই ঘোষণাটি জুনে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সম্মেলনে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের ইরানে বিমান হামলা ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে সম্মেলনটি স্থগিত হয়।

বিশ্লেষক রিম মমতাজ বলছেন, ম্যাক্রোঁ স্বীকৃতিকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন। যাতে করে আব্বাস ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে সংস্কারে বাধ্য করা যায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক আমজাদ ইরাকি বলেন, ইসরায়েলের অনমনীয় নীতির প্রতি হতাশা থেকেই ফ্রান্সের স্বীকৃতি এসেছে। তবে স্বীকৃতি দিলেই কার্যকর রাষ্ট্র তৈরি হয় না।

ফরাসি কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েল বহু মাস ধরে স্বীকৃতি ঠেকাতে চেষ্টার পাশাপাশি হুমকিও দিয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা কমানো, প্যারিসের আঞ্চলিক কৌশল বাধাগ্রস্ত করা, এমনকি পশ্চিম তীর দখলের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়।

বুধবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট একটি অনানুষ্ঠানিক ভোটে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি আইন প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। যা অঞ্চলটি দখলের লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে প্যারিসে স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

ফরাসি এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ইতিহাসের যদি কোনও সময় থেকে থাকে, তবে এই সময়ই সেই মুহূর্ত।

Translate