রবিবার ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬

পৃথিবীতে ‘ইতালি’ নামক কোন দেশই ছিল না!

ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ইতালি। ফুটবল, পিৎজা আর প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশীর বসবাস—সব মিলিয়ে দেশটি আমাদের বেশ পরিচিত। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উলটালে এক বিস্ময়কর তথ্য বেরিয়ে আসে—মাত্র ১৬৫ বছর আগেও ‘ইতালি’ নামে পৃথিবীতে কোনো স্বাধীন দেশ ছিল না। হাজার হাজার বছর ধরে এটি ছিল কেবলই একটি ভৌগোলিক ধারণা। তাহলে এই ইতালির জন্ম হলো কীভাবে?

নাম ছিল, দেশ ছিল না

ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ‘ইতালি’ শব্দটি ছিল কেবল একটি ভৌগোলিক পরিচয়। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান যুগে ‘ইতালিয়া’ বলতে দক্ষিণ উপদ্বীপের একটি অংশকে বোঝাত। মজার বিষয় হলো, রোমান সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগেও এই ভূমির পরিচয় ছিল ‘রোমান’। তখনকার মানুষ নিজেদের ‘ইতালিয়ান’ নয়, বরং ‘রোমান নাগরিক’ হিসেবে পরিচয় দিতেই গর্ববোধ করতেন।

৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর এই অঞ্চলটি অসংখ্য ছোট ছোট রাজ্য, পোপ শাসিত ‘পাপাল স্টেটস’ এবং স্বাধীন নগর-রাষ্ট্র—যেমন ভেনিস, ফ্লোরেন্স ও মিলানে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সময়ে মানুষ নিজেদের আঞ্চলিক পরিচয়েই অভ্যস্ত ছিল—কেউ ভেনেশিয়ান, কেউ ফ্লোরেন্টাইন বা নেপোলিটান। ‘ইতালিয়ান’ জাতীয়তাবোধ তখনও ছিল সুদূরপরাহত।

ভাষা: যখন দান্তের লেখনীতে এক হলো ইতালির আত্মা

রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর লাতিন ভাষা ভেঙে অসংখ্য আঞ্চলিক উপভাষার জন্ম হয়। এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের ভাষা বুঝত না। কিন্তু পরিবর্তন এল চতুর্দশ শতাব্দীতে। মহাকবি দান্তে আলিগিয়েরি তার অমর সৃষ্টি ‘ডিভাইন কমেডি’ রচনার জন্য তুস্কানি অঞ্চলের উপভাষাকে বেছে নেন। এরপর পেত্রার্ক ও বোকাসিওর মতো লেখকদের হাত ধরে এই উপভাষাটিই শিক্ষিত মহলে জনপ্রিয় হয়। ১৮৬১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই তুস্কানি উপভাষাই আধুনিক ‘ইতালীয় ভাষা’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। অর্থাৎ, রাষ্ট্র এক হওয়ার আগেই ভাষাই ইতালিকে এক সুতোয় গেঁথেছিল।

রিসোর্জিমেন্তো: ইতালির পুনরুত্থান

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিদেশি শক্তির (বিশেষ করে অস্ট্রিয়া) হাত থেকে মুক্তি পেতে ইতালীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জেগে ওঠে। এই আন্দোলনকে ইতিহাসে ‘রিসোর্জিমেন্তো’ (Risorgimento) বা পুনরুত্থান বলা হয়।

এই প্রক্রিয়ায় তিন মহাপুরুষের অবদান অনস্বীকার্য:

জুসেপ্পে মাজিনি: যিনি জাতীয়তাবাদের আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করেন।

কাউন্ট কাভুর: যার কূটনৈতিক কৌশলে ছোট ছোট রাজ্যগুলো একত্রিত হয়।

জুসেপ্পে গারিবাল্দি: যার বীরত্বে দক্ষিণ ইতালি জয় হয়।

অবশেষে ১৮৬১ সালের ১৭ মার্চ, দ্বিতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল নিজেকে ইতালির রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর ১৮৭০ সালে রোমকে রাজধানী করার মাধ্যমে আধুনিক ইতালির পথচলা পূর্ণতা পায়।

‘ইতালি তৈরি করেছি, এখন ইতালিয়ান তৈরি করতে হবে’

রাষ্ট্র একীভূত করার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘জাতি’ তৈরি করা। ইতালীয় রাজনীতিবিদ মাসিমো ডি’আজেগলিও সেই ঐতিহাসিক সত্যটিই বলেছিলেন—‘আমরা ইতালি তৈরি করেছি, এখন আমাদের ইতালিয়ান তৈরি করতে হবে।’ অর্থাৎ, ভূখণ্ড এক হলেও মানুষের মনে হাজার বছরের আঞ্চলিক পরিচয় মুছে একক জাতিসত্তা তৈরি করা ছিল এক কঠিন সংগ্রাম, যা শিক্ষা, প্রশাসন ও সাহিত্যের হাত ধরে সফল হয়েছে।

Translate