শনিবার ৪ঠা জুলাই, ২০২৬

দেয়ালে পিলারে ঝুলছেন ‘স্যারেরা’

‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’-কবি শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত পঙক্তিটি যেন আজ চট্টগ্রামের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বারবার মনে পড়বে। নগরের দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি, ফুটওভারব্রিজ, ফ্লাইওভারের পিলার-সবই যেন অস্থায়ী বিলবোর্ড। সেখান থেকে তাকিয়ে আছেন অসংখ্য ‘স্যার’। কেউ জীববিজ্ঞানের ‘ম্যাজিশিয়ান’, কেউ ইংরেজির ‘কিং’, কেউ আবার মেডিকেলের ‘স্বপ্নবিক্রেতা’।

শিক্ষাবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এটি শুধু দৃশ্যদূষণের বিষয় নয়; বরং নগরের নান্দনিকতা, নাগরিক শৃঙ্খলা এবং শিক্ষার ভাবমূর্তিরও প্রশ্ন। একের পর এক পোস্টারের স্তরে হারিয়ে যাচ্ছে শহরের সৌন্দর্য। একই সঙ্গে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে জ্ঞান ও শিক্ষাদানের চেয়ে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংই বেশি চোখে পড়ে। সবচেয়ে বড় বিদ্রপ, যাঁরা শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার পাঠ দেন, তাঁদেরই একটি অংশ নিয়ম ভেঙে শহরের দেয়াল-খুঁটি-পিলার দখল করছেন।

গত এক সপ্তাহে জিইসি মোড়, চকবাজার, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, আন্দরকিল্লা, জিইসি ও জামালখান ঘুরে দেখা গেছে, যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই হাসিমুখের পোস্টার। তাদের বেশিরভাগই জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও ইংরেজির শিক্ষক।

গোলজার মোড়েই ৪১ স্যার:

চট্টগ্রামের শিক্ষাপাড়া হিসেবে পরিচিতি আছে চকবাজারের। এখানকার বিদ্যুতের খুঁটি, ফুটওভারব্রিজ, সড়ক বিভাজক, সরকারি দেয়াল, এমনকি বিভিন্ন জনসাধারণের স্থাপনাও ব্যক্তিগত প্রচারণার ক্যানভাসে পরিণত হচ্ছে। শুধু চকবাজারের গোলজার মোড়ের চারপাশেই ৪১ জন ‘স্যারের’ পোস্টার দেখা গেছে।

সড়ক বিভাজক থেকে বিভিন্ন স্থাপনার দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে ফ্লাইওভারের পিলার-সবখানেই দেখা গেছে ডা. রিজভী ‘স্যারের’ পোস্টার। ‘বায়োলজির সেরা টেকনিক গল্প, ছন্দ, বেসিকে’ পড়ান লেখা হয় সেই পোস্টারে। পোস্টারের মাঝখানে কোথাও মাছ হাতে, কোথাও কঙ্কালের পাশে দাঁড়িয়ে হাসছেন এই ‘স্যার।’ এই ‘স্যারের’ সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

একইভাবে আছে গণিতের শিক্ষক ‘রিমন স্যারের’ পোস্টারও। রিমন রানা পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই প্রচারণা করি। আর আমি তো একা লাগাচ্ছি না, সবাই লাগাচ্ছেন। এখন মনে করুন আমি বন্ধ করে দিলাম, কিন্তু সবাই লাগাচ্ছে। তখন তো আমিই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। তবে সিটি করপোরেশন যদি এটার জন্য নিয়ম করে, আমরা সেটি মানতে চেষ্টা করবো।’

তবে কয়েকজন ‘স্যারের’ সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা যারা পোস্টারগুলো সাঁটান তাদের ওপর দোষ চাপান। তাঁরা জানান, যারা পোস্টার সাঁটানোর কাজে যুক্ত কাজ দেওয়ার সময় তাদের কিছু নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু তারা দ্রæত কাজ শেষ করার জন্য যত্রতত্র পোস্টার সাঁটিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন।

আইন আছে প্রয়োগ নেই:

যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগানো ঠেকাতে ‘দেওয়াল-লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’ রয়েছে। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত স্থান ছাড়া পোস্টার লাগানো দণ্ডনীয় অপরাধ; সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ডের বিধানও আছে। ২০২২ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পোস্টার লাগানোর জন্য ১১৬টি স্থানও নির্ধারণ করেছিল। সঙ্গে যারা নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে পোস্টার সাঁটাবেন, তাদের জরিমানা করা হবে বলেও জানানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেটির কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী ফি আদায় করা হয় এবং পরিচ্ছন্ন বিভাগ নিয়মিত অবৈধ পোস্টার অপসারণ করে। কিন্তু সকালে সরানোর পর বিকেলেই আবার নতুন পোস্টার লাগিয়ে দেওয়া হয়। ফলে কোনোভাবেই এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’

পোস্টার এখন ক্যান্সার:

শহরজুড়ে পোস্টার সাঁটানোর বিষয়টি এখন ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে পোস্টারনির্ভর প্রচারণা অর্থহীন। এতে দৃশ্যদূষণের পাশাপাশি শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। আমদানিকৃত কাগজও শেষ পর্যন্ত বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের একটা নীতিমালা আছে। কিন্তু তারা আইনের প্রয়োগটা ঠিকমতো করতে পারছে না। এ কারণে পোস্টার লাগানোর প্রবণতাও কমছে না।’

ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ সেকান্দার খান মনে করেন, ‘শ্রেণিকক্ষের চেয়ে কোচিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। কোচিং ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বাড়ায় পোস্টারিংও বেড়েছে। এ বিষয়ে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।’

ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, খাদ্যে ভেজাল কিংবা ফুটপাত বেদখল ঠেকাতে যেভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় ঠিক সেভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ব্যানার, পোস্টার অপসারণ এবং জরিমানা আদায়ের মতো আইনি ব্যবস্থা নেয়া গেলে এই প্রবণতা বন্ধ হয়ে যাবে।

এসএসসি ফল প্রকাশের পর কলেজে ভর্তি মৌসুম শুরু হবে। সেই সময়কে সামনে রেখেই এখন শিক্ষক ও কোচিংয়ের প্রচারণা বেড়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পোস্টারও একইভাবে শহর ঢেকে দিচ্ছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও পথশিশুকে দিয়েই বেশিরভাগ সময় তারা পোস্টারিংয়ের কাজ করান। প্রতিটি পোস্টার সাঁটাতে ৪-৫টাকা পর্যন্ত খরচ হয় তাদের।

স্থপতি আশিক ইমরানের মতে, রাজনৈতিক পোস্টারিং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কারণ, প্রভাবশালীদের লাগাম টানতে পারলে অন্যরাও নিয়ম মানতে বাধ্য হবেন।

নগরের চকবাজার এলাকায় কথা হয় শহরের বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একসময় এই শহরের দেয়ালে ফুটে উঠত শিল্প, সংস্কৃতি, স্বপ্ন আর প্রতিবাদের ভাষা। এখন সেই দেয়াল দখল করে নিচ্ছে একের পর এক পোস্টার। এতে শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছে শহরের নিজস্ব মুখ। মাঝে মাঝে মনে হয় চট্টগ্রামকে আজ সবচেয়ে বেশি ঢেকে রেখেছে ধোঁয়া বা কুয়াশা নয়, অনিয়ন্ত্রিত পোস্টারিং। শহরের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে তাই শুধু পোস্টার অপসারণ নয়, প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, নাগরিক সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল প্রচারণার সংস্কৃতিও।’ বন্দরনগরী তার সেই পুরনো সৌন্দর্য কবে ফিরে পাবে-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

Translate