বৃহস্পতিবার ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬

দেদার লুটপাট করেছেন বিমা কোম্পানির মালিকরা

জীবন বিমা মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়। কিন্তু সেই আশ্বাসই বহু মানুষের কাছে পরিণত হয়েছে প্রতারণার ফাঁদে। গ্রাহকের দেওয়া প্রিমিয়ামে গঠিত যে লাইফ ফান্ড থেকে মৃত্যুদাবি, মেয়াদপূর্তির অর্থ ও পেনশন পরিশোধ হওয়ার কথা, সেই তহবিলেই বছরের পর বছর ধরে চলে লুটপাট।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তছরুপ চলেছে, তার ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একাধিক অডিট ও তদন্ত প্রতিবেদনে। এসব প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিনটি জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড থেকেই আত্মসাৎ হয়েছে মোট ৩ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সেই লুট হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সে ৩৫৩ কোটি টাকা এবং হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সে ১০৪ কোটি টাকা উধাও হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। লাইফ ফান্ড থেকে অবৈধ ঋণ বিতরণ, ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, কাগুজে প্রকল্প এবং নিয়মনীতিবহির্ভূত ব্যয়ের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দাবি পরিশোধের সময় অনেককেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। আর কাগজে-কলমে দেখানো মুনাফার আড়ালে চাপা পড়ে থাকছে এই খাতের ভয়াবহ আর্থিক বাস্তবতা।

পাঁচ পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব।

বহু জীবন বিমা কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, শত শত কোটি টাকার সম্পদ, জমি, ভবন, শেয়ার ও বিনিয়োগের দীর্ঘ তালিকা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তদন্তে উঠে এসেছে, অনেক সম্পদের মূল্য কাগজে ফুলিয়ে দেখানো। জমি বা প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে অবিক্রয়যোগ্য। দাবি পরিশোধের সময় নগদ অর্থের সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তা গ্রাহকের কাজে আসছে না।

গতবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফের কাগজে-কলমে সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে এসব সম্পদের বড় অংশই নগদায়ন করার মতো অবস্থায় নেই। অনেক জমি ও ভবনের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, আবার অনেক সম্পদ ব্যাংক দায়, মামলা ও বন্ধকী জটিলতায় আটকে আছে। ফলে সম্পদ থাকলেও তা বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা দেওয়ার মতো বাস্তব সক্ষমতা নেই।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও নিরীক্ষা-ভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির তহবিলে জমা হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা—গ্রাহকদের প্রিমিয়াম, বিনিয়োগ ও মুনাফার অর্থ মিলিয়ে। এই বিশাল তহবিল গায়েব করা হয়েছে মূলত তিনটি কৌশলে।

বাজারমূল্যের তুলনায় ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি দামে জমি কেনা দেখানো হতো। অতিরিক্ত অর্থ চলে যেত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পকেটে। উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে তোপখানা রোডের জমি ও স্থাপনা, যেখানে ২০৭ কোটি টাকার লেনদেনে অন্তত ৪৫ কোটি টাকা সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে।

গ্রাহকদের অর্থে গড়া ডিপোজিট ব্যাংকে বন্ধক রেখে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হতো। ঋণ কোম্পানির নামে হলেও টাকা চলে যেত ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে।

প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ফি, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভুয়া বিলের নামে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে—সবই কাগজে-কলমে।

অডিট রিপোর্ট বলছে, ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা প্রমাণসহ আত্মসাৎ হয়েছে। ৪৩২ কোটি টাকার হিসাবে অনিয়ম হয়েছে। মোট দায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি।

লুটের সহজ ভাণ্ডার

লাইফ ফান্ড হলো গ্রাহকের দেওয়া প্রিমিয়াম থেকে গঠিত তহবিল, যেখান থেকে মৃত্যুদাবি, মেয়াদপূর্তির অর্থ ও পেনশন পরিশোধ হওয়ার কথা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহু জীবন বিমা কোম্পানিতে এই লাইফ ফান্ডই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ জায়গা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, একাধিক কোম্পানি লাইফ ফান্ড থেকেই পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের ঋণ দিয়েছে।শেয়ারবাজারে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করেছে। কাগুজে প্রকল্পে অর্থ ঢেলেছে। নিয়মবহির্ভূত প্রশাসনিক ব্যয় দেখিয়েছে।

ফলে যে তহবিল দিয়ে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ হওয়ার কথা, সেটিই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফাঁকা হয়ে গেছে।

যেভাবে ফারইস্ট লাইফের ফান্ড ফাঁকা

বিনিয়োগের নামে লাইফ ফান্ড ফাঁকা করতে দফায় দফায় বোর্ড সভা ও সাব-কমিটির কার্যবিবরণী ও রেজুলেশন জালিয়াতি করে জমি ক্রয় ও উন্নয়নের নামে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের লাইফ ফান্ড থেকে অর্থ সরানো হয়েছে। এর বড় অংশই লেনদেন হয়েছে নগদে, যা বিমা আইন ও আর্থিক বিধি-বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মিরপুরের গোড়ান চাটবাড়িতে মাত্র সাড়ে ১৪ কোটি টাকায় কেনা জমির কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকা। জমির প্রকৃত দামের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি খরচ দেখিয়ে লাইফ ফান্ড থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে যোগসাজশে এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা তখন ছিল নির্বিকার।

সাড়ে ১৪ কোটি টাকার জমিতে ১৪২ কোটি টাকার বালু

২০১৩ সালে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ এমপ্লয়ীজ কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও প্রাইম ইসলামী লাইফ এমপ্লয়ীজ কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে যৌথভাবে মিরপুর, গোড়ান, চাটবাড়িতে প্রায় ৭৬৩ শতাংশ জমি কেনা হয়। দলিল অনুযায়ী জমির মূল্য ছিল মাত্র ১৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।

তবে ওই জমিতে বালু ভরাট ও উন্নয়ন খরচ দেখানো হয় ১৪২ কোটি ৩০ লাখ টাকা—যা জমির দামের দশ গুণেরও বেশি। প্রতি শতক জমির দাম যেখানে দুই লাখ টাকার নিচে, সেখানে প্রতি শতকে উন্নয়ন ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি পরিকল্পিতভাবে লাইফ ফান্ড লুটের একটি বড় কৌশল। অনিয়ম এখানেই শেষ নয়। জমি রেজিস্ট্রেশনে যেখানে আনুমানিক খরচ হওয়ার কথা সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা, সেখানে ‘বিবিধ খরচ’ দেখিয়ে প্রায় ৭০ কোটি টাকার বেশি তুলে নেওয়া হয়েছে। নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রেজিস্ট্রেশন খরচ অতিরঞ্জিত দেখিয়ে অন্তত লাইফ ফান্ড থেকে ৭০ কোটি টাকা বেশি উত্তোলন করা হয়েছে।

জমি কিনেছে সোসাইটি, টাকা দিয়েছে লাইফ ফান্ড

বিমা আইন অনুযায়ী জীবন বিমা কোম্পানি কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির বিপরীতে সীমিত ঋণ দিতে পারে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র’র অনুমোদন এড়াতে হঠাৎ করে কর্মীদের নামে কো-অপারেটিভ সোসাইটি গঠন করে। এরপর সেই সোসাইটির নামে জমি কেনা হলেও জমির মূল্য, উন্নয়ন ও অন্যান্য ব্যয় মেটানো হয়েছে সরাসরি ফারইস্ট ইসলামী লাইফের লাইফ ফান্ড থেকে।

জমির দাম বাড়িয়ে দেখাতে একাধিকবার ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট সাব-কমিটি এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণী পরিবর্তন ও ‘সারসংক্ষেপ’ তৈরি করা হয়। একই বোর্ড সভার ভিন্ন ভিন্ন কার্যবিবরণী পাওয়া গেছে, যেখানে জমির পরিমাণ, দাম ও ব্যয়ের হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা।

আইডিআরএ’র’র অনুমোদন ছাড়াই জমি কেনা হয়েছে বলেও নথিতে প্রমাণ মিলেছে। এমনকি অনুমোদনে নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ থাকার পরও অধিকাংশ অর্থ নগদে পরিশোধ করা হয়েছে। যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ একাধিক আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের শামিল।

এই ঘটনায় ২০১৪ সালে আইডিআরএ তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪২ কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয় ‘কিছুটা বেশি’ হলেও বড়কোনও অনিয়ম পাওয়া যায়নি।

অবশ্য ফারইস্ট লাইফের সংকটের পেছনের চিত্র উঠে আসে আইডিআরএ’র বিশেষ অডিটে। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে আইডিআরএ প্রতিষ্ঠানটির ওপর বিশেষ অডিট পরিচালনার জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম শিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়োগ দেয়। ২০২২ সালের মে মাসে অডিট প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানি থেকে প্রায় ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া ৪৩২ কোটি টাকার হিসাব সংক্রান্ত অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।

এই অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে ফারইস্ট ইসলামীর সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও এম এ খালেক, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহ, সাবেক পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়।

অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মূলত দুটি কৌশলে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। একদিকে, বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে জমি ক্রয়, অন্যদিকে কোম্পানির মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (এমটিডিআর) বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। একই সময়ে আইডিআরএ তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহকে বরখাস্ত করে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ফারইস্ট লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। তবে, এত বড় অঙ্কের সম্পদ থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ রয়েছে, এ পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর কোনও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

আইডিআরএ’র মিডিয়া ও যোগাযোগ পরামর্শক সাইফুন্নাহার সুমি জানান, সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ বিমা দাবি পরিশোধের বিষয়ে কোম্পানিটির কাছে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা চাওয়া হলেও তারা তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, “কোম্পানিটিকে সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনা মানা না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তিনি আরও জানান, বর্তমান সংকট কাটাতে কোম্পানিটিকে ব্যবসা সম্প্রসারণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। “এই মুহূর্তে ব্যবসা সম্প্রসারণ কোম্পানিটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি।

ব্যবসা প্রায় বন্ধ—স্বীকার কোম্পানির

কোম্পানির সচিব কলিম উদ্দিন স্বীকার করেন, বকেয়া দাবি পরিশোধই এখন সবচেয়ে বড় সংকট। তার ভাষ্য, “বর্তমান আয়ের কাঠামো দিয়ে এই বকেয়া পরিশোধ সম্ভব নয়।” দীর্ঘদিন দাবি না দেওয়ায় নতুন পলিসি বিক্রি কার্যত বন্ধ, আয়ের উৎস শুকিয়ে গেছে।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের চলমান সংকট নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুর রহিম ভূঁইয়া বলেছেন, ২০২১ সালের পর থেকেই কোম্পানিটি টানা আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংকটে রয়েছে। সেই সময়ের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি কোনও বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে পারেনি।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আগের মালিকপক্ষ লাইফ ফান্ড থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ায় কোম্পানির সংকট আরও গভীর হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে।

ভারপ্রাপ্ত সিইও আরও বলেন, “বর্তমানে কোম্পানির বড় সমস্যা হচ্ছে তারল্য সংকট। পর্যাপ্ত সম্পদ থাকলেও সেগুলো বিক্রি করা যাচ্ছে না। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”

তবে পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী আব্দুর রহিম ভূঁইয়া। তার ভাষ্য, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সম্পদ বিক্রি করে ধাপে ধাপে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

খরচ কমাতে গাড়ি বিক্রি, কয়েক’শ কর্মী ছাঁটাই, অফিস একীভূতসহ নানা পদক্ষেপে সাশ্রয় হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অথচ, গ্রাহকদের বকেয়া দাবি ২ হাজার ৮১৫ কোটির বেশি। এই সাশ্রয়কে অনেকেই বলছেন—ডুবতে থাকা জাহাজে পানি সেচে টিকে থাকার চেষ্টা।

নজরুল–খালেক নেটওয়ার্ক

অডিট ও নথি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে একটি সংঘবদ্ধ আর্থিক সিন্ডিকেটের চিত্র। কেন্দ্রীয় চরিত্রে সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, এম এ খালেক ও সাবেক সিইও হেমায়েত উল্লাহ। তাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক ও রিয়েল এস্টেট খাতের প্রভাবশালী গোষ্ঠী।

এই নেটওয়ার্কই গত দুই দশকে একটি জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহকের নিরাপত্তার জায়গা থেকে সরিয়ে এনে পরিণত করেছে সংগঠিত লুটের বাজারে। আর তার মূল্য দিচ্ছেন হাজারো সাধারণ মানুষ—যাদের সঞ্চয়ের টাকা আজও আটকে আছে কাগুজে সম্পদের ফাঁদে।

আইডিআরএ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি

২০২১ সালে দেশের বিমা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ পায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফে। তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম গ্রাহকের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। কিন্তু এই অঙ্কের লুটপাটের পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএ কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বরং সেকেন্ডারি রেগুলেটর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানির বোর্ড বাতিল করে নতুন বোর্ড নিয়োগ দিয়েছে। অনুরূপ পরিস্থিতি দেখা গেছে সোনালী লাইফে, যেখানে গ্রাহক প্রিমিয়ামের ৩৫৩ কোটি টাকা অনিয়ম ও তছরুপের মধ্যে পড়লেও আইডিআরএকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি।

সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সেও বড় অঙ্কের আত্মসাৎ

সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও জামাতাসহ মোট সাতজনের নামে কোম্পানির তহবিল থেকে প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে এই কোম্পানির ওপর পরিচালিত এক বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

আইডিআরএ’র নিয়োগ করা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এই অর্থ তছরুপের ঘটনা ঘটে।

মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধে সোনালী লাইফের তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানিটিতে বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় আইডিআরএ এবং হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানিকে নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ভবনের নামেই ১৪১ কোটি টাকা

রাজধানীর মালিবাগে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন ‘ইম্পিরিয়াল ভবন’-এই সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান কার্যালয়। এই ভবন কেনাবেচাকে কেন্দ্র করেই কোম্পানির তহবিল থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের চিত্র উঠে এসেছে।

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি ভবন ক্রয়সংক্রান্ত দুটি সমঝোতা চুক্তির কপি পায়। প্রথম চুক্তিটি হয় ২০২১ সালে, যেখানে ভবনের মূল্য ধরা হয় ৩৫০ কোটি টাকা। পরের বছর, অর্থাৎ ২০২২ সালে সম্পাদিত দ্বিতীয় চুক্তিতে একই ভবনের দাম দেখানো হয় মাত্র ১১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই দুটি চুক্তির কোনোটিই সোনালী লাইফের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই করা হয়।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, জমি ও ভবন কেনার অগ্রিম দেখিয়ে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানকে সোনালী লাইফের লাইফ ফান্ড থেকে অবৈধভাবে ১৪১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। এর বাইরে সোয়েটার ক্রয়, আপ্যায়ন ও ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ একই প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে আরও ৭ কোটি ৮৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এসব তথ্য আইডিআরএ সংশ্লিষ্ট চিঠিতে উল্লেখ করেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ইম্পিরিয়াল ভবনের জমির মালিকানা ও ভবন নির্মাণসংক্রান্ত গুরুতর অনিয়মের কথাও উঠে এসেছে। জমির মূল দলিল, বায়া দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি কর পরিশোধের কোনও রশিদ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান পায়নি। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইডিআরএ জানিয়েছে, ৭ কাঠা জমির ওপর ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দপত্র, ইজারা চুক্তি ও নির্মাণ অনুমোদনের কোনও বৈধ নথিও পাওয়া যায়নি।

কোম্পানির টাকায় পারিবারিক সাম্রাজ্য

আইনে পরিচালকদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে কেবল পর্ষদ বৈঠকে অংশগ্রহণের সম্মানী। কিন্তু সোনালী লাইফে সেই আইন কার্যত উপেক্ষা করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি পারিবারিক বেতনভিত্তিক সাম্রাজ্য। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস কোম্পানির পর্ষদকে ব্যবহার করে নিজের পরিবারকে নিয়মিত মাসিক বেতনের আওতায় এনে কোম্পানির তহবিল লুট করেছেন।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস নিজে, তার স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়ে, এক জামাতা ও এক পুত্রবধূ—পরিবারের সাত সদস্য মাসে দুই লাখ টাকা করে বেতন নিয়েছেন। পরিবারের বাইরের পরিচালক নূর এ হাফজাও একই হারে বেতন পান। অর্থাৎ, আট পরিচালক ১৪ মাস ধরে মাসিক ১৪ লাখ টাকা করে তুলে নিয়েছেন, যার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এই বেতন গ্রহণের কোনও আইনগত ভিত্তি কিংবা পর্ষদের অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি।

কোম্পানির তহবিল থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করে কেনা হয় একটি বিলাসবহুল অডি গাড়ি। অথচ, আইডিআরএ’র প্রজ্ঞাপনে চেয়ারম্যানের জন্য গাড়ির সর্বোচ্চ মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা সরাসরি লঙ্ঘন করে দ্বিগুণ দামে গাড়ি কেনা হয়েছে।

পরিচালকদের নামে অতিরিক্ত লভ্যাংশ ও ব্যক্তিগত ব্যয়ের তালিকাও চোখ কপালে উঠার মতো। তারা ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা অতিরিক্ত লভ্যাংশ এবং শিক্ষা ও ভ্রমণ ব্যয়ের নামে আরও ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন। শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল গ্রুপ বিমা পলিসি থেকে অবৈধ কমিশন নেওয়ার পাশাপাশি পরিচালক না থাকা অবস্থায় অবৈধভাবে ১১টি পর্ষদ বৈঠকে অংশ নিয়ে সম্মানী গ্রহণ করেন।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, পরিচালক না হয়েও শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যৌথভাবে চেকে স্বাক্ষর করেছেন। এসব চেকের মাধ্যমে সোনালী লাইফের তহবিল থেকে ৩১ কোটি টাকা সরাসরি মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়—যা করপোরেট গভর্ন্যান্সের প্রকাশ্য ভঙ্গ।

এছাড়া কোরবানির গরু কেনা, পলিসি নবায়ন উপহার, ঋণ সমন্বয়, অনুদান, এসি ক্রয় এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) খরচের নামে আরও ৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা তোলা হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব ব্যয়ের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বৈধ অনুমোদনের অভাব পাওয়া গেছে।

মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন ড্রাগন আইটি, ড্রাগন সোয়েটার ও ড্রাগন স্পিনিং নামের পৃথক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোম্পানির অর্থ প্রবাহের চিত্রও উদ্বেগজনক। ড্রাগন আইটিকে অফিস ভাড়ার নামে প্রায় ১২ কোটি টাকা দেওয়া হয়, অথচ পুরো ইম্পিরিয়াল ভবনের ইউটিলিটি বিল বাবদ ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয় সোনালী লাইফের তহবিল থেকে। এমনকি ড্রাগন সোয়েটার ও ড্রাগন স্পিনিংয়ের ১৪ লাখ টাকার করও পরিশোধ করা হয়েছে বিমা কোম্পানির অর্থ দিয়ে।

এই অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস, তার স্ত্রী পরিচালক ফজলুতুন নেসা’সহ পরিবারের সাত সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। তবে, মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মারা গেছেন।

হোমল্যান্ড লাইফ থেকে আত্মসাৎ ১০৪ কোটি টাকা

হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সেও চিত্র ভিন্ন নয়। তদন্তে উঠে এসেছে, বোর্ড সভার কার্যবিবরণী জাল, ভুয়া ভাউচার তৈরি এবং কাগুজে খরচ দেখিয়ে কোম্পানি থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১০৪ কোটি টাকা। লুটপাটে সরাসরি জড়িত মালিকপক্ষ। ঘটনাটি তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

জানা গেছে, ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হোমল্যান্ড লাইফের পরিচালনা পর্ষদের সভায় (১৩১তম বোর্ড সভা) আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, জমি কেনার নামে অন্তত ১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই অনিয়ম ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটে ২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ে, এই সময়ে কোম্পানিটির পরিচালনায় ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান কাজী এনাম উদ্দিন আহমেদ, পরবর্তী চেয়ারম্যান আব্দুস শুক্কুর ও ফয়জুল হক। ওই সময়কার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে জমি ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে মোট ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। এই ১০৪ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয় এবং আদালত তদন্তের নির্দেশনাও দেন।

এদিকে আইডিআরএ’র হিসাবে হোমল্যান্ড লাইফ থেকে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ আরও বেশি—প্রায় ১৯৮ কোটি টাকা। আইডিআরএ’র তথ্যমতে, ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর নামে জমি কেনা, জমি কেনার কমিশন, জমিতে মাটি ভরাট, সার্ভিস সেন্টার (এজেন্ট অফিস) চালু, পারিবারিক বিমা কার্যক্রম এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আর্থিক অনিয়মের সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর। প্রতিনিয়ত হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও বহু গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে বিমা দাবির অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানির তহবিল থেকে লুট হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও চাপের মুখে পড়েন প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল। একপর্যায়ে এই বিষয়টি কেন্দ্র করেই তাকে চাকরি হারাতে হয় বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল বলেন, ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বহু পুরোনো। এ বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চান না।

গ্রাহকের টাকা স্বদেশ লাইফের এমডির পকেটে

স্বদেশ লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির একাধিক আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা ত্রুটি, বিমা আইন লঙ্ঘন, এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে।

কোম্পানির এসভিপি আলমগীর শেখ গত ৮ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগের কপি বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন’সহ (দুদক) বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীন গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের ৬০ লাখ ৭০ হাজার ৭১৭ টাকা নিজের ব্যক্তিগত হিসাবে গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি, নিয়মবহির্ভূতভাবে নেওয়া ইনসেনটিভ বোনাস বাবদ তিনি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ৫০৫ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মোট ক্ষতি ধরা হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ২২২ টাকা।

আইডিআরএ ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর এই অর্থ কোম্পানির হিসাবের মধ্যে জমা দেওয়ার জন্য লিখিতভাবে নির্দেশ দেয়। কিন্তু দেড় বছর অতিক্রম করলেও কোনও অর্থ ফেরত না দেওয়ায় ডিসেম্বরের দিকে আইডিআরএ থেকে দ্বিতীয়বারের জন্য টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে কাওসার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অতি সম্প্রতি ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীন সাহেবের কাছ থেকে কয়েক দফায় ইনসেনটিভ বোনাস ও গ্রাহকের টাকা আদায় করা হয়েছে।”

গ্রাহককে চাকরির প্রলোভন, ৩১ লাখ টাকা গায়েব

স্বদেশ ইসলামী লাইফের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ওঠা অভিযোগ আরও ভয়াবহ। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিমা পলিসি করাতে বাধ্য করে ১১ জন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে প্রায় ৩১ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে স্বদেশ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সাক্ষাৎকার ও নিয়োগপত্র—সবকিছুই ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউকেই চাকরি দেওয়া হয়নি, ফেরত দেওয়া হয়নি আদায়কৃত টাকাও।

চাকরির শর্তে বাধ্যতামূলক বিমা পলিসি

ভুক্তভোগীরা জানান, ইন্টারনেটে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে তারা স্বদেশ ইসলামী লাইফে আবেদন করেন। এরপর তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এবং নিয়োগপত্রও দেওয়া হয়। তবে চাকরিতে যোগদানের আগে কোম্পানির কর্মকর্তারা শর্ত দেন—প্রত্যেককে বিমা পলিসি খুলতে হবে।

শর্তে রাজি হয়ে ১১ জন চাকরিপ্রার্থী কিস্তিতে মোট ৩০ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের ২৫ মে থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে ধাপে ধাপে তাদের চাকরিতে যোগদানের কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও কাউকেই নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

আইডিআরএ ও পুলিশের কাছে অভিযোগ

প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছেও অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

ভুক্তভোগী আব্দুল মান্নান গত অক্টোবরে পল্টন মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

স্বদেশ ইসলামী লাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে কাওসার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই ঘটনা আমি যোগদানের আগে। তবে এটা স্বদেশ ইসলামী লাইফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। একটি প্রতারক চক্র স্বদেশ ইসলামী লাইফের নাম ভাঙিয়ে এই প্রতারণা করেছে। ইতোমধ্যে ওই প্রতারক চক্রের কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে।”

পদ্মা ইসলামী লাইফের প্রতারণা

জীবন বিমা খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়মের তালিকায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডকে ঘিরে উঠে আসা অভিযোগগুলো সেই পুরোনো কৌশলেরই আরও সংগঠিত ও পরিকল্পিত রূপের ইঙ্গিত দেয়।

আইডিআরএতে দেওয়া একাধিক লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, কোম্পানির তৎকালীন ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) সাজ্জাদ হোসেন ও জেনারেল ম্যানেজার মো. জিল্লুর রহমান চাকরির বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নারীদের উচ্চ বেতনের ব্যবস্থাপনা পদে নিয়োগের আশ্বাস দেন। কিন্তু বাস্তবে সেটি ছিল কমিশনভিত্তিক বিমা পলিসি বিক্রির ফাঁদ।

অভিযোগকারীরা জানান, “সম্ভব” নামের একটি অ্যাপসে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ইউনিট ম্যানেজার পদে নিয়োগ এবং মাসিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ফিক্সড বেতনের কথা বলা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে তারা দেখতে পান, সেটি পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান কার্যালয়।

ভুক্তভোগী শাহনাজ পারভীনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার পদে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয়। একইভাবে নদীয়া আক্তারের কাছ থেকে নেওয়া হয় ২২ হাজার ২০০ টাকা এবং নিগার সুলতানার কাছ থেকে নেওয়া হয় ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা। প্রাথমিক আলোচনায় ফিক্সড বেতনের কথা বলা হলেও টাকা দেওয়ার পর জানানো হয়—চাকরিটি কমিশনভিত্তিক, নির্দিষ্ট বেতন নেই এবং বড় অঙ্কের বিমা বিক্রির টার্গেট পূরণ করতে হবে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই শর্তে অসম্মতি জানিয়ে টাকা ফেরত চাইলে তাদের হাতে জোরপূর্বক বিমা পলিসির কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, চাকরির নামে নেওয়া নগদ অর্থকে পরে বিমা পলিসির প্রিমিয়াম হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

বিমা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, চাকরির নামে এ ধরনের প্রতারণা কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; এটি খাতজুড়ে চলমান অনিয়মের একটি প্রতিফলন। নিয়োগ, পলিসি বিক্রি ও কমিশন—এই তিনটি বিষয়কে একই সুতোয় বেঁধে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. মাইন উদ্দিন বলেন, “কিছু বিমা কোম্পানির মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে না। এই ধারণা থেকেই তারা গ্রাহকের অর্থ অপব্যবহার ও চাকরির নামে প্রতারণায় উৎসাহিত হচ্ছে।”

অনুমোদিত সীমার বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয়

২০২৪ সালে দেশের জীবন বিমা খাতের ৩৬টি কোম্পানির মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ কোম্পানি ইতিমধ্যেই আইডিআরএ নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করেছে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২০টি কোম্পানি অনুমোদিত সীমার বাইরে মোট ১৫৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। গ্রাহক প্রিমিয়ামের অর্ধেকের বেশি অর্থ খরচ করেছে ১৯টি কোম্পানি, যা আইনত অবৈধ এবং বিমা গ্রাহকের টাকা নষ্টের সমতুল্য।

বিমা আইন-২০১০ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, জীবন বিমা কোম্পানিগুলোকে নির্ধারিত ব্যয়সীমার মধ্যে থেকে পরিচালনা করতে হবে। আইডিআরএ’র নিয়মে বলা আছে, গ্রাহকের অর্থ অপচয় করা যাবে না। তবুও, পদ্মা ইসলামী লাইফ এবং সানলাইফ ইনস্যুরেন্সের মতো শীর্ষ অবস্থানের কোম্পানি সীমার দ্বিগুণ ব্যয় করেছে। স্বদেশ লাইফ ইনস্যুরেন্স এমনকি প্রিমিয়ামের চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে কমিশন, বেতন-ভাতা, অফিস ভাড়া এবং নানাবিধ অন্যান্য খাতে। ২০২৩ সালে বিধি লঙ্ঘনের কারণে অনেক কোম্পানিকে আইডিআরএ জরিমানা করেছিল। কিন্তু কোম্পানিগুলো যেন শিখছে না। বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এস আলম গ্রুপের ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স ৪৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে শীর্ষে আছে।

আইডিআরএ’র ২০২৪ বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদ্মা ইসলামী লাইফ ১১৭ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। সানলাইফ ইনস্যুরেন্সও ১০০ শতাংশের বেশি ব্যয় করেছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ৬২ শতাংশ, বায়রা লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, এনআরবি ইসলামিক লাইফ ও স্বদেশ লাইফ ৫০ শতাংশের বেশি এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ ৪৪ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যয় করেছে।

অন্যদিকে, মোট ১৬টি কোম্পানি অনুমোদিত সীমার মধ্যে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করেছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স ৯০ কোটি টাকা ব্যয় কমিয়ে সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে। এই ১৬ কোম্পানি মিলিয়ে প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে। আইডিআরএর তথ্যমতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানি ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে ৩ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা। অবশ্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে তারা ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়েছে ৯৮৮ কোটি টাকা।

১৫টি জীবন বিমা কোম্পানি ‘পরিচালনার অযোগ্য’

গতবছরের ২ জুলাই আইডিআরএ-এর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইডিআরএর চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম বলেন, “দেশের জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১৫টি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, যেগুলো কার্যত পরিচালনার অযোগ্য। আরও ১৫টি মধ্যম ঝুঁকিতে, আর ভালো অবস্থানে রয়েছে মাত্র ছয়টি কোম্পানি।”

আইডিআরএ’র অভ্যন্তরীণ গ্রেডিংয়ে যেসব প্রতিষ্ঠানকে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো হলো—সানলাইফ, হোমল্যান্ড, পদ্মা ইসলামী, প্রোগ্রেসিভ, প্রোটেক্টিভ ইসলামী, বেস্ট লাইফ, প্রাইম ইসলামী, যমুনা, ডায়মন্ড, স্বদেশ, সানফ্লাওয়ার, ফারইস্ট ইসলামী, গোল্ডেন, বায়রা লাইফ ও এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইনস্যুরেন্স।

Translate