বুধবার ৩রা জুন, ২০২৬

টিলার ভেতর গর্ত খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয় কিশোর বেলালের মাথা ও দেহ

প্রিয় বন্ধু পারভেজের ব্যাটারি রিকশায় ঘুরত মো. বেলাল (১৩)।  টাকার লোভে সেই বন্ধুকে কৌশলে ডেকে নিয়ে আরও কয়েকজন মিলে খুন করে। খুন করার পর তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে খুনিরা। পুলিশ যাতে বেলালের লাশ শনাক্ত করতে না পারে সেজন্য হত্যার পর তার মাথার চুলও কেটে আলাদা স্থানে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়। এরপর মাথা ও দেহ টিলার ভেতর গর্ত খুঁড়ে পৃথকভাবে পুঁতে রাখা হয়। একদল শেয়াল মাটি খুঁড়ে বেলালের মৃতদেহ বের না করলে হয়ত এ হত্যার রহস্য উন্মোচন হতো না। ক্ষুধার্ত শেয়ালগুলো মাটির নিচ থেকে তুলে এনে বেলালের অর্ধগলিত মৃতদেহ থেকে মাংস খেয়ে ফেলে। খুনের ১৮ দিন পর শিয়ালের ‘বদান্যতায়’ তার মৃতদেহটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। ২০২২ সালের জুলাই মাসে এ ঘটনা ঘটলে পুলিশ এ খুনের রহস্যের কূলকিনারা পাচ্ছিল না।  প্রায় ক্লুলেস (সূত্রবিহীন) খুন হিসেবেই গণ্য হয়ে আসছিল মামলাটি। পরে আদালতের নির্দেশে খুনের রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এবছরের ৭ মে রিকশাচালক মো. পারভেজকে সাতকানিয়া থানার বাজালিয়া বাজার থেকে গ্রেপ্তার করে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি ইন্সপেক্টর মোশারফ হোছাইন ও তার দল। এর পরেই ক্লুলেস মামলাটির জট খুলতে শুরু করে। পরের দিন ৮ মে পারভেজ চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুন -এর আদালতে হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত জানিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এতে ওঠে আসে পরিকল্পিত এক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনী, পরিকল্পনার বিস্তারিত।

বেলালকে খুন করার সময় কান্না করতে করতে বন্ধুর কাছে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিল। বলেছিল ‘আমার সব নিয়ে যাও, তবুও আমাকে মেরো না।’ কিন্তু এতে পাষণ্ড বন্ধুর মন একবিন্দুও গলেনি। সি আইডি পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডে পারভেজের সঙ্গে মূল পরিকল্পনায় থাকা আরেক ব্যক্তির পরিচয়ও বের করেছে। তার নাম মো. হাসান ওরফে সোনাইয়া (৩৬)।

আদালতসূত্র ও সি আইডিসূত্রে জানা যায়, প্রতিবেশী বন্ধু পারভেজের রিকশায় প্রায় ঘুরত বেলাল (১৩)। দরিদ্র পরিবারের সন্তান বেলালের এ ঘোরাঘুরির নেপথ্যে ছিল ইয়াবার কারবার। এক পর্যায়ে পারভেজ ইয়াবা কারবারের কথা জেনে যায়। এরপর থেকে পারভেজও টাকার লোভে পড়ে।  বেলালের কাছে পারভেজ ইয়াবা বিক্রয়ের লভ্যাংশের অর্ধেক দাবি করে। বেলাল এতে রাজি না হওয়ায় তার কাছ থেকে নগদ টাকা ও ইয়াবা ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে পারভেজ। বেলালের ইয়াবা ও টাকা ছিনিয়ে নিতে মো. হাসান ওরফে সোনাইয়া (৩৬) নামের এক পরিচিতকে ঠিক করে পারভেজ। আরও কয়েকজন মিলে বেলালকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে।  ২০২২ সালের ১৭ জুলাই রাত ৯ টার দিকে সাতকানিয়া থানার পুরানগড় সাঙ্গু কলেজের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে  বেলাল লুডু খেলছিল। এসময় বেলালকে কৌশলে ডেকে নিয়ে অপহরণ করে পারভেজ, হাসানসহ আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি। এরপর তাকে পুরানগড় এলাকার সাঙ্গু কলেজের পার্শ্ববর্তী আড়াষ্যা লম্বা পানি স্থানে নিয়ে যায়। পরে লম্বাপানি ব্রিজে নিয়ে বেলালের হাত-পা বেঁধে ফেলে তারা। ছিনিয়ে নেওয়া হয় বেলালের নগদ টাকা পয়সা ও মোবাইল ফোন। অভিযুক্ত হাসান কোদাল দিয়ে কুপিয়ে বেলালের মাথাটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। বেলালের পরিচয় গোপন করতে তার মাথার চুলও কেটে ফেলা হয়। পরে পার্শ্ববর্তী  একটি পাহাড়ের চূড়ায় বেলালের মৃতদেহ উলঙ্গ অবস্থায় মাটিচাপা দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ৪ আগস্ট একদল শিয়াল মাটির নিচ থেকে বেলালের লাশ তুলে তার মাংস খেতে থাকলে খবর পেয়ে পুলিশ গলিত লাশটি উদ্ধার করে। কিন্তু এ খুনের রহস্যের কূলকিনারা পাচ্ছিল না পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আদালতে দেওয়া পারভেজ জবানবন্দিতে বলেছে,  বেলালকে মারার সময় সে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, আমার সব নিয়ে যাও, প্রাণে বাঁচতে দাও। আমাকে মেরো না।’ এতেও খুনের সিদ্ধান্ত থেকে বিন্দু পরিমাণ টলেনি আসামিদের মন।

এ ঘটনার সাড়ে তিনবছর পর সিআইডি পুলিশ ক্লুলেস খুনের রহস্য উদঘাটন করেছে।  এর আগে  মামলাটি ক্লুলেসই ছিল। দেড়বছর আগে আদালত সিআইডিকে এ মামলার তদন্তভার দেন। এরপর থেকে মামলাটির রহস্য উদঘাটনে সিআইডি মরিয়া হয়ে কাজ করে। অবশেষ বেলালকে গ্রেপ্তারের পর এ খুনের রহস্য আলোতে আসে।

জানতে চাইলে সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্পেশাল পুলিশ সুপার মো. সালাহ উদ্দিন  পূর্বকোণকে বলেন, ‘সিআইডি ক্লুলেস  মামলার পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করতে পেরেছে। ইয়াবা বিক্রির লভ্যাংশ না পেয়ে ব্যাটারি রিকশাচালক পারভেজের পরিকল্পনায় কিশোর বেলালকে খুন করে লাশ গুম করা হয়।’

আদালত সূত্রমতে পারভেজ জবানবন্দিতে বলেছে, বেলালের বাবা একজন চাষি। তাদের পরিবার সাতকানিয়ার উঁচুর বিল পুরানগড় এলাকার পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস করে।  বেলাল অল্প বয়সেই টাকার লোভে পড়ে। এই কাজে সহায়তা করত রিকশাচলক পারভেজ। অবৈধ মাদক ব্যবসা করত বলে পারভেজকে দ্বিগুণ ভাড়া পরিশোধ করা হত। পারভেজ পরে মাদক বিক্রির লভ্যাংশের অর্ধেক দাবি করে। এতে রাজি না হওয়ায় তাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়।

বেলালকে লুডুর আসর থেকে সাকিবের মাধ্যমে ডেকে আনার পর বেলাল প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল। তার পকেট থেকে একটি টাকার বান্ডেল ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার পর হাসান বলেছিল, বেলালকে বাঁচিয়ে রাখলে সে এ ঘটনা ফাঁস করে দেবে। তাই বেলালকে হত্যা করে লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়।

এ খুনের ঘটনায় বেলালের বাবা মুন্সী মিয়া সাতকানিয়া থানায় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে  মামলাটি  করেছিলেন। খুনের রহস্য বের করতে না পারায় আদালত ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর মামলাটির তদন্তে সিআইডিকে নির্দেশ দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইন্সপেক্টর মোশারফ হোছাইন বলেন, নিহত বেলাল তখন কাদের সঙ্গে চলাফেরা উঠাবসা করত তা খুঁজতে গিয়ে রিকশাচালক পারভেজের সন্ধান মেলে। দীর্ঘ তদন্তে বারবার পারভেজের প্রতিই সন্দেহ তৈরি হয়। গত বৃহস্পতিবার তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পারভেজ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করা হলে সে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে রাজি হয়। তিনি বলেন, পারভেজ বাকি আসামিদের নাম বলেছে। আমরা অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।

 

 

বেলালের বাবা কৃষক মুন্সী মিয় বলেন, আমার ছেলেকে নির্দয়ভাবে খুনের বিচার চাই। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

Translate