বৃহস্পতিবার ১৬ই জুলাই, ২০২৬

জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় গ্রেফতার কে এই মোজাফফর

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সেনা বিদ্রোহে নিহত হয়েছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর লাশ গায়েব করার পেছনে ভূমিকা ছিল সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. মোজাফফর হোসেনের। সে সময় তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর পদ মর্যাদার কর্মকর্তা। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি পালিয়ে যান। তাকে ধরিয়ে দিতে সে সময় পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

দীর্ঘ ৪৫ বছর পর বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে রাজধানীর বনানী থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর সেনা বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে মেজর মোজাফফর সীমান্ত পথে দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আত্মগোপনে ছিলেন।

সামরিক ট্রাইব্যুনালে জিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

জিয়া হত্যা নিয়ে ১৯৯৪ সালের মে মাসে প্রোবনিউজের প্রধান সম্পাদক ইরতিজা নাসিম আলীর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দৈনিক ভোরের কাগজে ধারাবাহিক আট কিস্তিতে ছাপা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে ২৯ ও ৩০ মে তারিখের মধ্যবর্তী রাত সাড়ে ৩টায় তিনটি গাড়ি নিয়ে ১৬ জন সেনা কর্মকর্তা রওনা হন। প্রেসিডেন্ট জিয়া তখন সার্কিট হাউসে ঘুমিয়ে।

গুলি করতে করতে তাদের একটি দল দোতলায় উঠে যায়। গোলাগুলির শব্দ শুনে বাইরে কী হচ্ছে দরজা ফাঁক করে দেখার চেষ্টা করলেন জিয়া। তখন গর্জে ওঠে আততায়ীর হাতের অস্ত্র। ৯ মিনিটেই অপারেশন শেষ। ভোর সাড়ে ৪টার কিছু পরে মেজর মোজাফফর হোসেন চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ২৪ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মনজুরকে ফোন করে জানালেন, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড।’

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ওইদিন সার্কিট হাউসে গুলিতে নিহত হয়েছিলেন আরও দুই সেনা কর্মকর্তা– লে. কর্নেল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খান। এরা ছিলেন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের সদস্য।

মেজর জেনারেল আবুল মনজুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি উপন্যাস লিখেছেন সাংবাদিক ও লেখক মশিউল আলম। ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’ নামের সেই উপন্যাসে তিনি বিভিন্ন জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে তৈরি করেছেন। তার মতে, রাঙ্গুনিয়া থেকে প্রেসিডেন্ট জিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। সেখানেই তাকে কবর দেওয়া হয়। কবর দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মেজর মোজাফফরের ওপর। কর্নেল মতিউর তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন জিয়ার লাশ সার্কিট হাউস থেকে নিয়ে চট্টগ্রামের কোনও পাহাড়ের খাদে ফেলে দিয়ে আসতে। কিন্তু পাহাড়ের কোনও খাদে ফেলে না দিয়ে মেজর মোজাফফর রাঙ্গুনিয়ায় এক গ্রামের কাছে সমতলে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় সেখানে কবর দেন। পাথরঘাটা সেই গ্রামের নাম। গ্রামবাসীর সহায়তায়, তাদের কোদাল-খুন্তি দিয়ে গর্ত খুঁড়ে একই গর্তে তিনজনের লাশ সমাহিত করে রেখে আসেন তারা। তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ ও ওসি কুদ্দুসের নেওয়া সাক্ষাৎকারে মশিউল আলম এটুকু জেনেছেন।

পহেলা জুন জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ খুঁজতে বের হয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ (প্রয়াত বিএনপি নেতা)। পরবর্তীকালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হান্নান শাহ জানিয়েছিলেন যে, জিয়াউর রহমানের মরদেহ খুঁজে বের করার জন্য তারা কাপ্তাই রাস্তার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন এবং অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নতুন কবরের সন্ধান করছিলেন।

তখন সেখানকার গ্রামবাসী একটি ছোট পাহাড় দেখিয়ে জানালেন, কয়েকদিন আগে সৈন্যরা সেখানে একজনকে কবর দিয়েছেন। গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হান্নান শাহ সৈন্যদের নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন— নতুন মাটিতে চাপা দেওয়া একটি কবর। সেখানে মাটি খুঁড়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আরও দুই সেনা কর্মকর্তার মৃতদেহ দেখতে পান তারা। তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ তুলে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আনা হয়।

সেখান থেকে পরে হেলিকপ্টারে করে রাষ্ট্রপতির মৃতদেহ ঢাকায় আনা হয়। এরপর ১৯৮১ সালের পহেলা জুন ঢাকায় আনার পর তাঁর মৃতদেহ প্রথমে জনসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য ২ জুন সকাল ১১টা পর্যন্ত সংসদ ভবনে রাখা হয়। পরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা শেষে ক্রিসেন্ট লেকের উত্তর পাশে (বর্তমানে চন্দ্রিমা উদ্যান) দাফন করা হয়।

Translate