রবিবার ৩রা মে, ২০২৬

জাস্বান্ত গড়

জাস্বান্ত গড়—এই নামটি উচ্চারণ করলেই মনের মধ্যে এক ধরনের গর্ব, শ্রদ্ধা আর গা ছমছমে অনুভূতি জাগে। অরুণাচল প্রদেশের পাহাড়ি পথ ধরে যখন আপনি তাওয়াংয়ের দিকে এগিয়ে যান, তখন মাঝপথে এসে একটি ছোট পাহাড়ি বাঁকে চোখে পড়ে একটি সাদা পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ। অনেকের কাছেই এটা হয়তো একটা যুদ্ধের নিদর্শন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা এক সাহসিকতার মন্দির।

জায়গাটি যে ইতিহাস বহন করে তা শুরু হয় ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের সময় থেকে। সে সময় ভারতীয় সেনা চীনা বাহিনীর চাপে একের পর এক পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু সবার পিছু হটার মাঝেও এক সৈনিক, মাত্র ২১ বছর বয়সী জাস্বান্ত সিং রাওয়াত, সিদ্ধান্ত নেন তিনি পিছু হটবেন না। পাহাড়ের সেই ঠাণ্ডা, বরফে ঢাকা মোড়ে দাঁড়িয়ে তিনি একা থেকে গিয়েছিলেন দেশ রক্ষায়। শত্রুপক্ষের বিশাল বাহিনী তার দিকে এগিয়ে এলেও, জাস্বান্ত তিন দিন ধরে লড়াই চালিয়ে যান।

এই সময় তাঁর সঙ্গে ছিল স্থানীয় দুই মেয়ে—নুরা ও সেলা। এই দুই পাহাড়ি মেয়ে রাতদিন তাঁকে সাহায্য করত—একজন বন্দুক রিলোড করে দিত, আরেকজন খাবার, গুলি সরবরাহ করত। তাঁরা কৌশলে বিভিন্ন বাঙ্কারে গিয়ে গুলি ছুড়তেন, যাতে শত্রুরা ভাবে পুরো একটি ইউনিট এখনো প্রতিরোধ করছে। এই পরিকল্পনা ছিল এতটাই সফল যে চীনারা ভেবেছিল ভারতীয় বাহিনী এখনও জমি ছাড়েনি।

তবে চূড়ান্ত মুহূর্তে যখন ধোঁয়া কেটে যায়, যখন চীনা বাহিনী ধীরে ধীরে বুঝে ফেলে এটি একক প্রতিরোধ, তখন তারা আক্রমণ করে জাস্বান্তের শেষ ঘাঁটি। তখনও তিনি হাল ছাড়েননি। কথিত আছে, বন্দি হওয়ার আগেই তিনি নিজের বন্দুক থেকে নিজেকেই গুলি করেন। মৃত্যুর পরে চীনা বাহিনী তার মাথা কেটে নিয়ে যায় পুরস্কার হিসেবে। কিন্তু তারা এতটাই মুগ্ধ হয়ে পড়ে এই সাহসী যুবকের সাহসে, যে তার দেহ ফেরত দিয়ে যায় সম্মানসহ।

এমন আত্মত্যাগ ইতিহাসে বিরল। আর তাই ভারতের সেনাবাহিনী আজও বিশ্বাস করে, জাস্বান্ত সিং রাওয়াত মরে যাননি। তিনি এখনো পাহাড় পাহাড়া দেন, এই সীমান্তের রক্ষাকর্তা হয়ে।

আজ জাস্বান্ত গড়ে গেলে আপনি দেখতে পাবেন তার একটি ঘর, যেখানে আজও বিছানাটি গুছানো থাকে। সেনা সদস্যরা প্রতিদিন তার ইউনিফর্ম ব্রাশ করেন, তার জন্য রুটিনমাফিক খাবার তৈরি করেন। এমনকি তার নামে রেজিস্টারে ‘ডিউটি ইন’ সই করা হয়। তাঁর রাইফেল, জুতা, ঘড়ি—সবই সাজানো আছে তার ঘরে, যেন তিনি যে কোনো মুহূর্তে ফিরে এসে তা পরবেন।

ঘরের বাইরে রয়েছে একটি ছোট জাদুঘর। সেখানে রাখা রয়েছে ঐতিহাসিক দলিল, তার পদক, তার যুদ্ধের সময়কার ছবি। পাশেই একটি বারান্দা, যেখানে বসে আপনি তুষারঢাকা পাহাড়ের দিকে তাকাতে পারেন—যেদিকে তাকিয়ে তিনি শেষ গুলি ছুড়েছিলেন। চারপাশের আবহাওয়াও এখানে যেন ভিন্ন। বাতাসে থাকে এক ধরনের শান্তি, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেও একটা চাপা গর্জন লুকানো থাকে—যেন এক বীর সৈনিকের ধ্যানমগ্ন চিৎকার।

জাস্বান্ত গড় কোনো পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি তীর্থক্ষেত্র। এখানে এসে কেউ চিৎকার করে ছবি তোলে না, হাসাহাসি করে না। এখানে কথা হয় ধীরে, হাঁটাহাঁটিও হয় নীরবে। প্রত্যেক দর্শনার্থীর চোখে মুখে থাকে একধরনের শ্রদ্ধা, যেন তারা কোনও জীবন্ত মানুষকে দেখতে এসেছে।

সেনারা এখনো বলেন, রাতের পাহারায় অনেক সময় তারা অনুভব করেন, জাস্বান্ত বাবু পাহাড়ে হাঁটছেন। কেউ কেউ বলেন, তারা মাঝেমধ্যেই তাঁর ছায়া দেখেছেন, বিশেষ করে বর্ষার রাতে বা তুষারপাতের মৌসুমে। বিশ্বাস করুন বা না করুন, এই গল্পগুলোই বলে দেয়, একজন সত্যিকারের সৈনিক কখনো মৃত্যুবরণ করেন না—তাঁরা পাহাড়ে রয়ে যান, মাতৃভূমির ছায়ার মতো।

এই স্মৃতিসৌধে গিয়ে দাঁড়ালে আপনি শুধু এক তরুণ সেনার আত্মত্যাগ দেখবেন না—আপনি দেখতে পাবেন এক আদর্শ, এক বিশ্বাস এবং এক আত্মশক্তি যা মানুষকে অসীম করে তোলে।

Translate