রবিবার ২১শে জুন, ২০২৬

চট্টগ্রামে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’: বড় বাধা গ্যাস সংকট

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার চট্টগ্রামকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নিলেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সংকট। খনি থেকে উত্তোলন কমে আসায় এবং এলএনজির সক্ষমতা না বাড়ায় চাহিদার দুই তৃতীয়াংশ গ্যাসও মিলছে না শিল্পাঞ্চলে। ফলে প্রধান সমুদ্রবন্দর, বড় শিল্পনগর, অনেক রপ্তানি শিল্পের সূতিকাগার হলেও চট্টগ্রামে নতুন শিল্প কারখানা চালু করতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী- চট্টগ্রামে প্রতিদিন অন্তত ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। তবে পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী- চলতি জুন মাসে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদিন গড়ে ২৪০-২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই হিসাব বলছে- চাহিদার দুই তৃতীয়াংশ গ্যাসও পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিল্পখাতে।

কেউ লোকসানে, কেউ বিকল্পের খোঁজে:

পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে ধুঁকছে চট্টগ্রামের শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে রয়েছে সাদ মূসা গ্রুপ। বড় এই শিল্পগ্রুপটি কর্ণফুলী নদীর তীরে সাদ-মুসা শিল্পপার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। ব্যাংক লোন নিয়ে সেখানে ২৪টি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করে। তবে গ্যাস সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে না পারায় শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে। তাদের নাম উঠে আসে শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায়।
সিমেন্টশিল্পে মূলত জেনারেটর চালু রাখতে, কাঁচামাল শুকাতে গ্যাসের প্রয়োজন হয়। তবে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হচ্ছে সেখানে। এতে খরচ বাড়ায় উৎপাদন ঠিক রাখা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আমিরুল ইসলাম জানান, গ্যাস সংকটের কারণে সিমেন্টশিল্পে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে।

নতুন বিনিয়োগে বড় ধাক্কা:

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যমতে- গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিভাগে নিবন্ধিত বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ৪১২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিবন্ধিত বিনিয়োগের এই পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৫০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। যার বড় কারণ গ্যাস সংকট।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বিডার একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছরে বিনিয়োগ কমলেও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিলো ৮০টি। গত অর্থবছরে সেটি দাঁড়ায় ১৪৬টিতে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে চান- কিন্তু গ্যাস সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ ব্যাংক সুদসহ নানা কারণে পারছেন না।

ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা প্রতিকার চান:

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের দাবি- দেশে দৈনিক ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এরমধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপন করা এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আসা প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যায় চট্টগ্রাম দিয়ে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ না করে অন্য অঞ্চলে গ্যাস নিয়ে যাওয়া চট্টগ্রামের প্রতি ‘বিমাতাসুলভ আচরণ’।

পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন- বিজিএমইএর প্রাক্তন প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেশকে ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বানাতে প্রধান সমুদ্র বন্দরের অবস্থানসহ নানা কারণে চট্টগ্রামকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারখানাগুলো এখানে হলে রপ্তানি পণ্য পরিবহনসহ নানা ক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন উদ্যোক্তারা। তাই গ্যাস সংকট মেটাতে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন কূপ স্থাপনে মনোযোগ দেওয়া উচিত।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি এ. এম. মাহবুব চৌধুরীর বলেন, ভারী শিল্প খাতে একের পর এক সংকট লেগে আছে। এর মধ্যেই গ্যাস সংকটে উৎপাদন পুরোপুরি চালু রাখা নিয়ে সংশয়ে আছেন উদ্যোক্তারা। নতুন কারখানাও চালু করা যাচ্ছে না। ফলে গত অর্থবছরে চট্টগ্রামে মাত্র ২ হাজার ৪১৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম।

 

প্রয়োজন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা:

গ্যাস সংকট সমাধানে এখনই স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন চুয়েটের পেট্রোলিয়াম এন্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, এলএনজির আমদানি বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদি সমাধান হতে পারে। তবে বিদ্যমান ভাসমান টার্মিনাল যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগে বন্ধ হয়ে যায়, তাই ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল করে এলএনজি ও এলপিজির আমদানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে চুয়েটের এই সহকারী অধ্যাপক বলেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ছাড়া বাংলাদেশে গ্যাস সংকটের পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। সমুদ্র-সমতল সব জায়গায় দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা জরুরি। বিশ্বে ৬টি কূপ খনন করলে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ৩টি কূপ খনন করলেই একটিতে গ্যাস পাওয়ার রেকর্ড আছে। বাপেক্স উদ্যোগী হলেই নতুন গ্যাস কূপ আবিষ্কার করা কঠিন কিছু নয়।

গ্যাস সরবরাহ কর্তৃপক্ষ যা বলছে:

গ্যাসের সংকট থাকলেও শিল্পাঞ্চলে সংযোগ দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে বলে দাবি কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক আমিনুর রহমানের। তিনি জানান, শিল্পাঞ্চলে নতুন গ্যাস সংযোগ ও লোড বাড়ানোর আবেদনগুলো ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে গ্যাসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। যেখানে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব না, সেখানে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণেই সবাই গ্যাস পাচ্ছেন না।

Translate