চট্টগ্রামে ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়, বরং বছরজুড়েই ঘরে ঘরে হানা দিচ্ছে এই ভাইরাস। চিন্তার বিষয়, ডেঙ্গুর চারটি ভিন্ন রূপ বা ধরণ (সেরোটাইপ) সক্রিয় থাকায় সাধারণ মানুষের জন্য ডেঙ্গুর ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। ২০২৩ সালে দেশজুড়ে ডেঙ্গুর যে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, তার বড় ধাক্কা লেগেছিল চট্টগ্রামেও। সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিগত বছরগুলোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আর সরকারি হাসপাতালগুলোর উপচে পড়া রোগীর ভিড়ই স্পষ্ট ছিল সনাতন পদ্ধতি ব্যবহারে এই বড় সংকট সামলানো অসম্ভব।
চট্টগ্রামের ডেঙ্গুর এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবার মাঠে নামছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা ও মানবিক সংস্থা ‘মেডিসিন্স সান্স ফ্রন্টিয়ার্স’ (এমএসএফ-হল্যান্ড)। শুধু পরামর্শই নয়, ২০২৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী এক পরিকল্পনায় সরকারি দপ্তর ও হাসপাতালগুলোতে কাজ করবেন এই সংস্থার আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
জানা যায়, গত ২৩ জুন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং এমএসএফ-এর মধ্যে এই চুক্তি সই হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি এবং এমএসএফ-এর পক্ষে মেডিকেল কোঅর্ডিনেটর ডা. কারমেঞ্জা গালভেজ চুক্তিতে সই করেন। এছাড়াও পৃথকভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু) এর সাথেও এ সংক্রান্ত চুক্তি হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ডেঙ্গু মোকাবিলায় অতীতে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা দেখা যেত, তা দূর করতে এবার এক বিশেষ प्रशासनिक ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের সিভিল সার্জন কার্যালয় অফিস, সিটি কর্পোরেশন, সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সব হাসপাতালকে এই একটি কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় তা একক কোনো সংস্থার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এই চুক্তির মাধ্যমে আমরা শহরের সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বয় কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে আমরা মশা নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার মান উন্নত করতে একসঙ্গে কাজ করব, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যায়।
এদিকে, চুক্তির পটভূমিতে চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ঘনবসতি, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চট্টগ্রামে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। ফলে ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমী সমস্যা নয়। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, ডেঙ্গুর চারটি রূপই (সেরোটাইপ) এখন চট্টগ্রামে একসাথে সক্রিয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য পুনঃসংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল ও বিআইটিআইডি-এর মতো বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই বাড়তি চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এমএসএফ-এর এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দিক হলো এর আধুনিক তথ্য ও নজরদারি ব্যবস্থা। কেবল বাইরে থেকে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া নয়, এমএসএফ তাদের নিজস্ব রোগতত্ত্ববিদ (মহামারি ও রোগ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ) এবং মেডিকেল ডেটা অফিসারদের সরাসরি সরকারি অফিস ও হাসপাতালগুলোতে নিয়োগ দেবে। তারা ল্যাবরেটরি ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিকভাবে জানাবে, শহরের কোন এলাকায় ডেঙ্গু বেশি ছড়াচ্ছে এবং পরবর্তী সংক্রমণ কোথায় হতে পারে। এর ওপর ভিত্তি করে আগেভাগেই মশক নিধন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাশাপাশি, যদি হঠাৎ করে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুহার অনেক বেড়ে যায়, তবে সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়াতে (যেমন জরুরি শয্যা ও আইসিইউ সংখ্যা বৃদ্ধি) সরাসরি প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক সাপোর্ট দেবে এমএসএফ। চুক্তির আওতায় মশার আচরণ ও নতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে মাঠপর্যায়ে বিশেষ গবেষণাও করা হবে। প্রাথমিকভাবে ২০২৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তীতে উভয় পক্ষের সম্মতিতে আরও বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় প্রশাসনের এই যৌথ প্রচেষ্টা যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তবে চট্টগ্রামবাসী ডেঙ্গুর এই বড় সংকট থেকে মুক্তি পাবে।