জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, বৈষম্য হ্রাস ও বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা; এই তিন লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা। তাদের মতে, সঠিক নীতি গ্রহণ করা হলে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৮৯ শতাংশ মানুষের আয় দ্বিগুণ হতে পারে।
ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের (ডব্লিউআইএল) প্রকাশিত গ্লোবাল জাস্টিস রিপোর্ট-এ এ দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু বিপর্যয়, রাজনৈতিক চরমপন্থা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার মতো বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত প্রচেষ্টা।
প্রতিবেদনে বিলিয়নিয়ারদের ওপর উচ্চ হারে সম্পদকর আরোপ, কর্মঘণ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা এবং শিল্প ও খনির মতো উপাদাননির্ভর খাত থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের সহপরিচালক এবং প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক টমা পিকেটি বলেন, ‘একটি বিশাল সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক লড়াই চলছে। এতে আমাদের সবারই ভূমিকা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট ছোট ট্রাম্পদের যে মতাদর্শ আমরা দেখছি, তা কোনও সমাধান দিতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত সম্পদ ও ক্ষমতার এ ধরনের সহযোগিতামূলক পুনর্বণ্টনের দিকেই যেতে হবে। অন্যথায় পরিবেশ, জলবায়ু এবং সামাজিক ক্ষেত্র সবখানেই ভয়াবহ পরিণতি হবে।’
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত বামপন্থি রাজনীতির অতিরিক্ত বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবেশবাদীদের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের সীমাবদ্ধতা এবং জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্যানেলের সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণের ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হয়েছে।
৪৫ জন লেখকের যৌথ এ গবেষণায় বিশ্বের ২০০ জনের বেশি গবেষকের সংগৃহীত তথ্যভান্ডার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূল ধারণা হলো ‘পর্যাপ্ততা’। অর্থাৎ, মানুষ ক্রমাগত আরও বেশি ভোগ বা সম্পদ সঞ্চয়ের চেষ্টা না করেও সমৃদ্ধ ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে।
এ লক্ষ্য অর্জনে তিনটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, বছরে গড় কর্মঘণ্টা ২ হাজার ১০০ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ১ হাজার ঘণ্টায় নামিয়ে আনা, যা সপ্তাহে আড়াই দিন কাজের সমান। দ্বিতীয়ত, লাল মাংস কম খাওয়ার উৎসাহ দেওয়া, কারণ এটি বন উজাড় ও পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম কারণ। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে কম ভোগনির্ভর কর্মকাণ্ডের দিকে নিয়ে যাওয়া।
পিকেটি বলেন, ‘শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অতিরিক্ত এক ইউরো ব্যয় করলে, উৎপাদনশিল্পে একই পরিমাণ ব্যয়ের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ কম উপাদান ও জ্বালানি ব্যবহার হয়। এ কারণেই খাতভিত্তিক এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বৈষম্য কমানো। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষে বিশ্বে মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় হবে মাসে ৫ হাজার ইউরো। এতে প্রায় সবার আয় বাড়বে, বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে। তবে জলবায়ু সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হওয়ায় অতিধনীদের ওপর উচ্চ হারে কর আরোপ করা হবে।
এ পরিকল্পনায় বিশ্বের মোট সম্পদের মধ্যে বিলিয়নিয়ারদের অংশ ৬ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমে আসবে। অন্যদিকে, বিশ্বের নিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের সম্পদের অংশ ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০ শতাংশ হবে।
প্রতিবেদনের আরেকটি অগ্রাধিকার হলো কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে এনে জলবায়ু ঝুঁকি কমানো। এ জন্য বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে মূলধন সরিয়ে বায়ু, সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, যাতে ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাত পুরোপুরি বিদ্যুতায়িত ও কার্বনমুক্ত করা যায়।
গবেষকদের পূর্বাভাস, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে শতাব্দীর শেষে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা সম্ভব হবে। ধীরগতির কার্বনমুক্তকরণ এবং ক্রমবর্ধমান ভোগনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে যেখানে তাপমাত্রা ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরে অর্থায়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বিশ্ব জিডিপির ১৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৮ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যে একটি ‘গ্লোবাল জাস্টিস ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একটি বৈশ্বিক সার্বভৌম তহবিল গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ‘বাসযোগ্য ও সমতাভিত্তিক একবিংশ শতাব্দী বাস্তবিক অর্থেই সম্ভব। এর পথে বাধা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় জোট গঠনের কঠিন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজ।’
প্রতিবেদনের সহলেখক এবং ডব্লিউআইএলের পরিবেশবিষয়ক সমন্বয়ক কর্নেলিয়া মোহরেন স্বীকার করেন, এ পরিকল্পনা ‘স্বপ্নময়, এমনকি কিছুটা কল্পনাপ্রসূত’ মনে হতে পারে। তবে তার মতে, অন্য পথও যে সম্ভব, তা দেখানোর জন্য এমন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘সমতাভিত্তিক একটি বিশ্ব গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে কার্বন বাজেটের মধ্যে থাকা সম্ভব, এটি জানা ভালো। এ ফলাফল আমাকে আশাবাদী করে। আমরা দেখেছি কী সম্ভব, আবার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা কতটা কঠিন, সেটিও দেখছি।’
পিকেটি বলেন, সাম্প্রতিক ইতিহাসই দেখায় যে এ লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। সুইডেন ও নরওয়ের মতো দেশ একসময় চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের মুখে ছিল। কিন্তু সরকারি নীতি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে তারা দ্রুত বৈষম্য কমাতে পেরেছে। একইভাবে উনিশ শতকের পর থেকে ইউরোপে কর্মঘণ্টাও অর্ধেকে নেমে এসেছে।
তার মতে, বৈষম্য হ্রাস ও পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার প্রশ্নকে একসঙ্গে বিবেচনা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে ফ্রান্সে কার্বন করবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের মতো পরিস্থিতি আবারও তৈরি হতে পারে।
পিকেটি বলেন, ‘আপনি যদি এটিকে বিশ্লেষণের কেন্দ্রে না রাখেন এবং শুধু বিমূর্তভাবে সবুজ নীতি বা পরিবেশ নিয়ে কথা বলেন, তাহলে এটি কোনোভাবেই কাজ করবে না।’
৪ থেকে ৬ জুন প্যারিসে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি কনফারেন্সে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন ও আলোচনা করা হবে। এতে হা-জুন চ্যাং, জ্যঁ দ্রেজ, জয়তি ঘোষ, মারিয়ানা মাজুকাতো, ব্রাঙ্কো মিলানোভিচ, লেয়া ইপি ও গ্যাব্রিয়েল জুকমানসহ বিভিন্ন গবেষক অংশ নেবেন।
বার্সেলোনার অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো জেসন হিকেল বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ। প্রযুক্তিগতভাবে এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। আমরা পৃথিবীর সীমার মধ্যে থেকেই সবার জন্য ভালো জীবন নিশ্চিত করতে পারি। তবে তা বাস্তবায়নে সংগঠিত রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রয়োজন হবে।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান