সোমবার ১৫ই জুন, ২০২৬

ইরান যুদ্ধে যে ক্ষেপণাস্ত্রে বাজি ধরছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান আকাশযুদ্ধে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ভূমিভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। যুদ্ধের শুরুর কয়েক ঘণ্টায় পারস্য উপসাগরের ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে উড়ে গিয়ে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে মার্কিন সেনাবাহিনীর দুই বছর বয়সী অত্যন্ত নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র। এটির কেতাবি নাম ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’। এটি ছিল এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম কোনও যুদ্ধকালীন ব্যবহার। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।

মার্কিন বিমান বাহিনীর জেনারেল এবং জয়েন্ট চিফস-এর চেয়ারম্যান ড্যান কেইন গত সপ্তাহে বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো ‘ইতিহাস তৈরি করেছে’। তিনি জানান, এসব হামলার মাধ্যমে ইরানের নৌবাহিনীর জাহাজ এবং বন্দরে থাকা সাবমেরিন ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ভূমিভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তাদের অফশোর তেল শোধনাগার খার্গ দ্বীপে আঘাত হেনেছে।

পেন্টাগন এখন তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় ভূমিভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করছে। বিশেষ করে ভ্রাম্যমাণ হিমার্স ট্রাক লঞ্চার থেকে ছোঁড়া নতুন সংস্করণের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ড্রোন যুদ্ধের যুগে অনেক বেশি কার্যকর। কারণ এগুলো দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যেতে পারে, ফলে শত্রুর পাল্টা হামলার ঝুঁকি কম থাকে।

পেন্টাগনের এই কৌশলগত পরিবর্তন মূলত ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো বিদ্রোহ দমনের লড়াই থেকে সরে এসে চীন বা ইরানের মতো বড় শক্তির বিরুদ্ধে প্রথাগত যুদ্ধের প্রস্তুতিকে নির্দেশ করে। অ্যাটাকমস এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলগুলো ২০০ থেকে ৩০০ মাইল পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারে। এর অর্থ হলো, এগুলো সম্ভবত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ড থেকেই ছোঁড়া হয়েছে। যদিও কোনও দেশই তাদের ভূমি বা আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে হামলার অনুমতি দেওয়ার কথা স্বীকার করেনি।

ইরান যুদ্ধে যে ক্ষেপণাস্ত্রে বাজি ধরছে যুক্তরাষ্ট্র

উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধে এক কঠিন পথে হাঁটছে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে জনসমক্ষে নিজেদের নিরপেক্ষ প্রমাণের চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যালেক্স ভাটানকা বলেন, আমেরিকা যদি এই শাসনব্যবস্থা শেষ করে দেওয়ার কোনও পথ দেখাতে পারে, তবে দেশগুলো বর্তমানের চেয়েও বেশি ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের মাঝপথে তারা আমেরিকাকে ‘না’ বলার অবস্থায় নেই।

লকহিড মার্টিনের তৈরি এসব ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে ওড়ে এবং স্যাটেলাইট গাইডেড সিস্টেমের কারণে লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত করতে পারে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজও চলছে যা ১ হাজার মাইলের বেশি দূরে শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিতে আঘাত হানতে সক্ষম।

সাবেক মার্কিন কমান্ডার ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকেঞ্জি বলেন, “এটি অনেক আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র কেবল অস্ত্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করছে।” একাধিক দিক ও ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতা থেকে আক্রমণ করার মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া। এতে যুদ্ধবিমানগুলো চলমান লক্ষ্যবস্তু এবং বোমারু বিমানগুলো সুরক্ষিত বা ভূগর্ভস্থ অবস্থানে আঘাত করার জন্য বাড়তি সুযোগ পায়।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভকে এই হিমার্স ও অ্যাটাকমস সরবরাহ করেছিল, যা রাশিয়ার কমান্ড সেন্টার ও গোলাবারুদের ভাণ্ডারে টান দিয়েছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দাবি করেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হিমার্স ব্যবহার করে খার্গ দ্বীপে হামলা হয়েছে। যদিও আমিরাত সরাসরি এই দাবি স্বীকার করেনি। অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের যাচাইকৃত ভিডিও ফুটেজ বলছে, অন্তত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র বাহরাইন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, যা ইরান থেকে মাত্র ১২৫ মাইল দূরে অবস্থিত।

ইরানি নৌবাহিনীর ওপর এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পেন্টাগনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি ইরানি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ডুবে গেছে। এর মধ্যে সোলাইমানি-ক্লাস যুদ্ধজাহাজ, মাইনলেয়ার এবং ড্রোন ক্যারিয়ারও রয়েছে।

তবে পেন্টাগনের জন্য এর আরেকটি বড় দিক হলো চীনকে বার্তা দেওয়া। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধলে ফিলিপাইনের মতো দ্বীপগুলোতে এই একই ধরণের মোবাইল মিসাইল মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা গ্রান্ট রুমলি বলেন, “ইরানের বিরুদ্ধে এই ক্ষেপণাস্ত্রের সফল ব্যবহার চীনের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।”

 

Translate