মঙ্গলবার ১৯শে মে, ২০২৬

আল-আকসার কাছে ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তি জব্দের পথে ইসরায়েল

জেরুজালেমের ওল্ড সিটির পবিত্র আল-আকসা মসজিদের কাছাকাছি এলাকায় ফিলিস্তিনিদের মালিকানাধীন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পরিকল্পনা আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে ইসরায়েল সরকার। ফিলিস্তিনিদের দাবি, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো পুরো শহরটিকে ‘ইহুদিকরণ’ করা।

রবিবার ইসরায়েলি মন্ত্রীরা আল-আকসা মসজিদের দিকে যাওয়ার প্রধান পথ চেইন গেট সংলগ্ন এলাকায় পুরোনো সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ আদেশ বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের অনুমোদন দিয়েছেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও হিব্রু সংবাদমাধ্যমগুলো এই পদক্ষেপকে ওল্ড সিটিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করার এবং জাফা গেট, ইহুদি কোয়ার্টার ও ওয়েস্টার্ন ওয়ালের সংযোগকারী পথগুলোকে সুরক্ষিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর যেসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, সেগুলোর ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ মালিকানা সম্পন্ন করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি নথিতে ওল্ড সিটির এই ঐতিহাসিক বাজেয়াপ্তকরণ আদেশ ‘বাস্তবায়ন’ করার কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন এই কমিটি আইনি এবং পরিকল্পনাসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো খতিয়ে দেখবে, যার কারণে গত কয়েক দশক ধরে এই প্রক্রিয়াটি ঝুলে ছিল। জেরুজালেম পৌরসভার তথ্যমতে, এই আদেশের ফলে ফিলিস্তিনিদের মালিকানাধীন ১৫ থেকে ২০টি বাড়ি ও দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

চেইন গেট সড়কটি ওল্ড সিটির অন্যতম জনাকীর্ণ এবং সংবেদনশীল এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে। আল-আকসা মসজিদের ইমাম শেখ একরিমা সাবরি জানান, এই সংকীর্ণ পাথুরে পথটি সরাসরি আল-আকসার পশ্চিম গেটের দিকে গেছে। এর দুই পাশে মামলুক ও অটোমান আমলের শত বছরের পুরোনো ভবন, ঐতিহাসিক ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকান ও ছোট ছোট রেস্তোরাঁ রয়েছে। নিশানা করা এই ভবনগুলোর অনেকগুলোই আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সের চারপাশের ইসলামি ওয়াকফ সম্পত্তি ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।

শেখ একরিমা সাবরি বলেন, ‘দখলদারদের প্রতিটি পদক্ষেপই জেরুজালেমের নিজস্ব পরিচয় পরিবর্তনের কাজে নিয়োজিত। এটি এই শহরকে ইহুদিকরণের আরেকটি অপচেষ্টা।’ গাজায় চলমান গণহত্যা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে ওল্ড সিটিতে ইসরায়েলের এমন আগ্রাসী পদক্ষেপে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা ও অধিকারকর্মীদের মতে, বিশ্বের মনোযোগ এখন অন্য দিকে থাকায় জেরুজালেমের এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

জেরুজালেম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ খলিল তাফাকজি জানান, নিশানা করা এই সম্পত্তিগুলোর বেশির ভাগই ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পরপরই জনকল্যাণ আইনের অধীনে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। সাধারণত স্কুল, হাসপাতাল ও পাবলিক অবকাঠামো তৈরির জন্য এই আইনি প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করা হলেও, ইসরায়েল ওল্ড সিটির বড় অংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় স্থানান্তর করতে এর অপব্যবহার করেছে।

তাফাকজি বলেন, ‘এই সম্পত্তিগুলো জনকল্যাণের নামে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের কাছে সেই জনগণ মানে ছিল কেবল ইসরায়েলি জনগণ; কোনও ফিলিস্তিনি, মুসলিম বা খ্রিস্টান জনগণ নয়।’ দখলের পর কয়েক দশকে বহু ফিলিস্তিনি পরিবারকে এই এলাকা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যার ফলে বর্তমানে বাব আল-সিলসিলা এলাকায় মাত্র অল্প কয়েকজন ফিলিস্তিনি বাসিন্দা অবশিষ্ট আছেন।

তাফাকজি মনে করেন, ইসরায়েল মূলত ওল্ড সিটির এই কৌশলগত এলাকার নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে বর্তমান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। ইতোমধ্যে কিছু ভবনের ওপরের তলাগুলো ইসরায়েলি সেটেলাররা দখল করে নিয়েছে, আর নিচতলায় ফিলিস্তিনিদের দোকানগুলো এখনো সচল রয়েছে।

আল-আকসার ইমাম শেখ একরিমা সাবরি জানিয়েছেন, ইসলামি কর্মকর্তা এবং ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলো আইনি ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা জেরুজালেমের ইসলামি ওয়াকফের সঙ্গে যুক্ত জর্ডানের কর্মকর্তাদেরসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

Translate