সোমবার ১৫ই জুন, ২০২৬

আবার আষাঢ় এলো স্নিগ্ধ মধুর

নেচে ফেরে ঝিরি ঝিরি বাদল-বাতাস/ থমথমে আষাঢ়ের প্রথম প্রকাশ/ আবার আষাঢ় এলো স্নিগ্ধ মধুর/ সারারাত ধারাপাত, র্ঝু র্ঝু র্ঝু………..মানুষ প্রেমে পড়ে কদমের, বরষার এবং বৃষ্টির রিমঝিম মায়াময়ী শব্দের। কারণ আষাঢ় সবার ভালোবাসার। আকাশে মেঘেদের আনাগোনা থাকুক বা না থাকুক, বৃষ্টির অঝোর ধারা আসমান হতে বেয়ে পড়ুক কিংবা না পড়ুক আজ পহেলা আষাঢ়। বর্ষা মৌসুমের প্রথম মাস এটি।

শুরু হলো গাছের পাতা, টিনের চাল কিংবা ছাদের রেলিং ছুঁয়ে রিমঝিম ছন্দে বৃষ্টি পড়ার দিন। সবুজের সমারোহে নতুন প্রাণের বার্তা নিয়ে এসেছে আষাঢ়। আকাশ ছেয়েছে মেঘের ঘনঘটায়। শহরে আষাঢ় খুব একটা পরিবর্তন না আনলেও গ্রামীণ জনপদের আষাঢ় মাসের জন্য প্রস্তুত মাঠ ঘাট জনজীবন।আষাঢ় মানে ঘন কালো মেঘ, ঝুম বৃষ্টি আর পাগলা হাওয়া। আষাঢ় মানে টিনের চালে রিমঝিম ছন্দ। স্কুল ছুটির পর বৃষ্টিতে দল বেঁধে ফুটবলে মেতে উঠা। প্রার্থনা শেষ হতেই বৃষ্টির আগমনী গর্জনে বাড়ে কৃষকের ব্যস্ততা। গরমের উত্তাপ ছাপিয়ে আষাঢ়ে নেমে আসে মেঘদূত। বৃষ্টির প্রতি ফোটায় প্রশান্তি ছড়িয়ে যায় শহর, নগর, বন্দর ছাপিয়ে পাড়া মহল্লায়। আকাশের জল ভিজিয়ে দেয় মন ও শরীর। ভিজে তৃপ্ত হয় প্রকৃতি। নদীতে বাড়ে পানি আরও বাড়ে মাছের সংলাপ। সাদা বক সহজেই খুঁজে পায় তার প্রিয় শিকার। আর বৃষ্টি বাড়লে জমিতে কৃষক নেমে পড়ে জাল হাতে। গ্রামের পথ দিয়ে কৃষানি ফিরে যায় বাড়ি। আকাশ থেকে যায় মেঘেদের দখলে।

আষাঢ় শুধু প্রকৃতির নয়, বাঙালির সমাজ-সংস্কৃতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ষায় নারীদের কদম ফুলের টান, প্রেমিক-প্রেমিকার ছাতা ভাগাভাগি, গান-কবিতায় জলছবি— এসব শতবর্ষের ঐতিহ্য। গ্রামীণ জীবনে বর্ষা মানে ছাতা হাতে স্কুলে যাওয়া, কাদায় বল খেলা, কিংবা দাওয়ায় বসে গল্প আর ভেজা খিচুড়ির ঘ্রাণে মুগ্ধতা। এই সময় কাব্য, সংগীত, নাটক—সবকিছুতেই বর্ষার ছোঁয়া। বৃষ্টিভেজা রাত বা মেঘলা দিনের অনুভূতি জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্ত নাগরিকের জন্য বর্ষা যেন এক প্রশ্বাস।

আষাঢ়ের রয়েছে ভয়ংকর সৌন্দর্য, পাশাপাশি তার আশীর্বাদে প্রকৃতি ভরে ওঠে ফুলে-ফসলে। ঋতু বৈচিত্র্যে আষাঢ়ের এমন স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের এই গানটিতে। জ্যৈষ্ঠের খরতাপে যখন মাটি ফেটে চৌচির, কাঠফাটা রোদে পিপাসায় পথিকের ছাতি ফেটে যায়। ঠিক সেই সময় স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে আষাঢ়। আরো নিয়ে আসে ফুল ও ফসলের বার্তা। রসসিক্ত হয়ে ওঠে প্রকৃতি, উর্বর মাটিতে বৃক্ষ জন্মে। সবুজ হয়ে ওঠে দেশ। এসবই আষাঢ়ের অবদান।কিন্তু নগর জীবনে আষাঢ়ের বৃষ্টি আশীর্বাদের বদলে বয়ে আনে দুর্ভোগ। বিশেষত রাজধানী ঢাকাতে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আর ভারী বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি হলে সড়কে জমে হাঁটু পানি, কোথাও কোথাও কোমর পানি।নর্দমার নোংরা পানির সঙ্গে বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে যায়। চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে।একই পরিস্থিতি রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রামেও দেখা যায়। সেখানেও সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ এলাকা চলে যায় পানির নিচে। জনজীবনে নেমে আসে সীমাহীন কষ্ট আর দুর্ভোগ। তাই যতই গুণ থাকুক, বাংলাদেশে নগরজীবন আষাঢ়বান্ধব নয়। এ ছাড়া এ সময়ে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি বজ্রপাতের ঘটনা এত বেশি ঘটতে দেখা গেছে যে, প্রতিদিন এতে প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। তাই বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই আষাঢ় আমাদের কাছে কখনো আশীর্বাদ, কখনো অভিশাপ। তবে অভিশাপটি মানবসৃষ্ট, এতে আষাঢ়ের ওপর দায় চাপানো অবিচার।

Translate