জীবনের দৌড়ঝাঁপ, ব্যস্ততা আর কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি যখন আমাদের মন ও শরীরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন নাড়ির টানে কিংবা একটু শান্তির খোঁজে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটা তীব্র হয়ে ওঠে। অনেকদিনের সেই সুপ্ত বাসনাটিকে বাস্তবে রূপ দিতেই গত সপ্তাহে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম চট্টগ্রাম থেকে মহেশখালীর ঐতিহাসিক আদিনাথ মন্দির দর্শনে যাওয়ার। এই ভ্রমণটি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান দেখার বেড়ানো ছিল না, বরং বাবা, মা, ছোট বোন আর আমি—চারটি প্রাণ একসাথে মিলে জীবনের কোলাহল থেকে দূরে কিছু অন্তহীন সুন্দরের মুখোমুখি হওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ ছিল।
ভোরবেলা যখন শহরের ঘুম ভাঙেনি, তখন আমাদের ছোট্ট দলটি চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে রওয়ানা হলো। ভোরের নরম কুয়াশা ভেদ করে আমাদের গাড়ি যখন এগিয়ে চলল, তখন চারপাশের প্রকৃতি ছিল অপরূপ শান্ত ও স্নিগ্ধ। শাহ আমানত সেতু পেরিয়ে কর্ণফুলী নদী পার হওয়ার সময় পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম উঁকি দেওয়ার দৃশ্যটি ছিল চমৎকার। নদীর চরে জমে থাকা কুয়াশার চাদর আর মাঝিদের নৌকায় করে নদী পারাপারের দৃশ্য দেখে ছোট বোন উন্মুখ হয়ে সেলুলয়েডে বন্দি করতে শুরু করল মুহূর্তগুলো। চকরিয়া পেরিয়ে আমাদের গাড়ি এসে থামল বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী মহেশখালী যাওয়ার মূল ট্রলার বা স্পিডবোট ঘাটে। গাড়ির জানালা খুলে আসতেই নাকে এসে লাগল নদী আর সমুদ্রের মিশ্রিত এক পরিচিত নোনতা হাওয়া, যা আমাদের মনে ভ্রমণের আসল শিহরণ জাগিয়ে তুলল।
ঘাট থেকে যখন আমরা একটি দ্রুতগামী স্পিডবোটে উঠলাম, তখন উত্তেজনায় মায়ের মুখ কিছুটা ভয়ের আভা দেখা দিলেও বাবার আশ্বাসে তা নিমেষেই কেটে গেল। লাইফ জ্যাকেট পরে আমরা যখন মাঝ নদীতে এলাম, তখন চারপাশের দৃশ্যপট আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে দিল। মহেশখালী চ্যানেলের নীল জলরাশির ওপর দিয়ে আমাদের স্পিডবোট যখন বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলল, তখন জলের ছিটে এসে লাগছিল আমাদের গায়ে। মাথার ওপর খোলা নীল আকাশ, দূর সমুদ্রে জেলের ট্রলারের অলস ভেসে থাকা এবং চারপাশের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের সবুজ রেখা—সব মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। জলের কলকল শব্দ আর ইঞ্জিনের গর্ভধ্বনির মধ্যে ছোট বোনের খিলখিল হাসি আমাদের পুরো যাত্রাপথকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। মাত্র পনেরো-কুড়ি মিনিটের এই জলপথ পার হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম মহেশখালী জেটিতে।
মহেশখালী জেটিঘাট থেকে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সায় চড়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ঐতিহাসিক মৈনাক পাহাড়ের পাদদেশে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৮৮ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই পাহাড়টি যেন সবুজ চাদরে মোড়ানো কোনো এক রূপকথার রাজ্য। গাড়ি থেকে নামতেই আমাদের স্বাগত জানাল প্রাচীন সব বিশাল গাছের শীতল ছায়া আর নাম না জানা হাজারো পাখির কলকাকলি। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত আদিনাথ মন্দিরে পৌঁছানোর জন্য রয়েছে কংক্রিটের পাকা সিঁড়ি। মায়ের হাঁটুর সামান্য সমস্যা থাকায় আমরা কোনো তাড়া না করে একেবারে ধীরেসুস্থে বিরতি নিয়ে ওপরে উঠছিলাম। সিঁড়ির দুই পাশে ঘন সবুজ গাছপালা, বুনো লতাগুল্ম এবং পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা ভেজা মাটির গন্ধ চারপাশকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে তুলেছিল। হাঁটতে হাঁটতে বাবা থেমে গিয়ে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “দেখো বাবা, প্রকৃতির এই নিস্তব্ধতা শহরের কৃত্রিম কোলাহল থেকে কত দূরে, কত আপন!” বাবার সেই কথাটি আমার হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে গেল।
ধীরে ধীরে হেঁটে আমরা যখন পাহাড়ের চূড়ায় মূল চত্বরে এসে পৌঁছলাম, তখন চারপাশের প্যানোরামিক ভিউ দেখে আমাদের সবার চোখ চড়কগাছ! একদিকে চোখ জুড়ানো সবুজে ঘেরা মৈনাক পাহাড়ের ঢেউ খেলানো রূপ, আর অন্যদিকে দৃষ্টিসীমাহীন দিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের উত্তাল নীল জলরাশি। সাগর থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা হাওয়া আমাদের গায়ে লাগতেই পাহাড় চড়ার সমস্ত ক্লান্তি এক নিমিষে উড়ে গেল। চূড়ায় অবস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান তীর্থক্ষেত্র মহাদেব আদিনাথ মন্দিরে প্রবেশ করতেই চারপাশের বাতাসে যেন এক পরম শান্তি নেমে এল। মন্দিরের ভেতরে জ্বলন্ত প্রদীপের আলো, ধূপ-ধুনার পবিত্র সুবাস আর পুরোহিতের মৃদু মন্ত্রপাঠ পরিবেশটাকে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ ও পবিত্র করে তুলেছে। বাবা অত্যন্ত ভক্তিভরে পূজা দিলেন। আমরা সবাই মিলে চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করলাম পরিবারের সবার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু আর সুখ-শান্তির জন্য। ইতিহাস বলে, ত্রেতাযুগে রাজা মান্ধাতা এখানে শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন—এই প্রাচীন ইতিহাস মন্দিরটিকে আরও বেশি রহস্যময় ও মহিমান্বিত করে তুলেছে।
মন্দির দর্শন শেষে আমরা পাহাড়ের উত্তর পাশের একটি উন্মুক্ত পাথুরে পয়েন্টে গিয়ে বসলাম। তখন বিকেল গড়িয়ে সূর্য নামার সময় হয়েছে। পশ্চিমাকাশের দিগন্তে সূর্য তখন ধীরে ধীরে তার সোনালী আর রক্তিম আভা ছড়িয়ে সাগরের নীল জলে তলিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাগরের বুকে সেই সূর্যের সোনালী প্রতিচ্ছবি এক অনবদ্য দৃশ্যের জন্ম দিয়েছিল। প্রকৃতির এই পরম রূপ দেখে হঠাৎ খেয়াল করলাম মায়ের চোখ দিয়ে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ছে। মা আমাদের হাত শক্ত করে ধরে বললেন, “এমন একটি পবিত্র ও সুন্দর জায়গায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে আসতে পেরে বুকটা ভরে গেল।” মায়ের চোখের সেই জল কোনো দুঃখের ছিল না, ছিল পরম তৃপ্তি আর কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। এই মুহূর্তটিতে আমরা উপলব্ধি করলাম, জীবনের অর্থ বড় বড় অর্জনে নয়, বরং আপনজনদের সাথে এমন ছোট ছোট সুন্দর মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার মাঝেই লুকিয়ে আছে আসল সুখ।
সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে আমরা পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে সন্তর্পণে নিচে নেমে এলাম। ফেরার পথে মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু পান কিনে নিলাম। জেটি ঘাটে যখন পৌঁছলাম, তখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে এবং দূর সাগরের বুকে জেলের ফিশিং ট্রলারগুলোর হলুদ আলো জোনাকির মতো জ্বলজ্বল করছে। চট্টগ্রামে আমাদের নিজ গৃহে ফিরে আসার পরও যেন আদিনাথ পাহাড়ের সুশীতল হাওয়া, সাগরের গর্জন আর পরিবারের সাথে কাটানো সেই মধুর সময়গুলোর সুবাস আমাদের মনে লেগেই ছিল। এই ভ্রমণটি আমাদের পারিবারিক জীবনের অ্যালবামে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সোনালী একটি পাতা হয়ে চিরকাল খোদাই করা থাকবে।