ইয়েমেনে হুথি–সৌদি আরব সংঘাত: বর্তমান পরিস্থিতি, কারণ, প্রভাব ও সম্ভাব্য সমাধান——গাজী মুহাম্মদ শাহজাহান।

ইয়েমেনে হুথি–সৌদি আরব সংঘাত: বর্তমান পরিস্থিতি, কারণ, প্রভাব ও সম্ভাব্য সমাধান——গাজী মুহাম্মদ শাহজাহান।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন ও সৌদি আরবের মধ্যকার সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সংকট। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে সংঘাতটি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মাত্রা লাভ করে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই কমে এলেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি আবারও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংঘাত এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ বা সৌদি সীমান্ত-নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ইরান–সৌদি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, বাব আল-মান্দাব প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থা।

ইয়েমেনের বর্তমান সংকটের শিকড় দেশটির দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে। ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুহ মানসুর হাদির সরকারকে ক্ষমতা থেকে কার্যত সরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি দ্রুত গৃহযুদ্ধে রূপ নিলে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। সৌদি আরবের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে সমর্থন করা এবং হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো।

এই সংঘাতের সঙ্গে শুরু থেকেই আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুক্ত হয়েছে। সৌদি আরব হুথিদের ইরান-সমর্থিত একটি শক্তি হিসেবে দেখে এবং তার দক্ষিণ সীমান্তের কাছে এমন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর শক্তিশালী অবস্থানকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। অন্যদিকে হুথিরা নিজেদেরকে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে এবং সৌদি সামরিক হস্তক্ষেপ ও অবরোধের বিরোধিতা করে। ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যদিও হুথিরা নিজেদেরকে ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রিত বাহিনী হিসেবে উপস্থাপন করে না।

২০২২ সালের এপ্রিল মাসে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক মেয়াদ পরে শেষ হলেও সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সরাসরি ও পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক শান্তিচুক্তিতে পরিণত হয়নি। ফলে সংঘাতের মূল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়।

২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি আবার দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। জুলাইয়ের শুরুতে সানা বিমানবন্দরকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং হুথি–সৌদি সম্পর্কের অবনতির পর হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়ায়। এরপর সৌদি ও মিত্র ইয়েমেনি বাহিনীর পাল্টা সামরিক অভিযানও শুরু হয়। সেপ্টেম্বরে এই সংঘাত আরও গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায়।

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ হুথিরা রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। হুথিরা ইয়ানবু, তায়েফ, বায়শ ও ফারাসানসহ বিভিন্ন স্থানের লক্ষ্যবস্তুর কথাও জানায়। এসব দাবির কিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হলেও রিয়াদে বিস্ফোরণ ও ধোঁয়ার দৃশ্য দেখা যায় এবং সৌদি কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা নিশ্চিত করেছে। 

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ১৮ সেপ্টেম্বর হুথিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলার নিন্দা করেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এসব হামলায় বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছে এবং বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা ও হামলার হুমকি বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চল ও লোহিত সাগরের উপকূল। সাম্প্রতিক লড়াইয়ে হুথিদের আঞ্চলিক অগ্রগতি এবং বাব আল-মান্দাবের দিকে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়া আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ। সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তৈরি হলে জাহাজ চলাচলের সময়, পরিবহন ব্যয়, বীমা ব্যয় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। 

সৌদি আরবের জন্য হুথি হামলার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। তাই ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা যদি বড় কোনো তেল স্থাপনা, বন্দর বা পরিবহন অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষতি করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে হুথিদের জন্য সৌদি আরবের সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধ একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। হুথি নেতৃত্ব বারবার বলে আসছে, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমায়, তাহলে তারা আলোচনার পথ গ্রহণ করতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা সৌদি ভূখণ্ড ও সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা ও ইচ্ছার কথাও প্রকাশ করছে। এসব বক্তব্য হুথিদের নিজস্ব অবস্থান; সৌদি আরব সংঘাতের দায় ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। 

ইরানের ভূমিকা এই সংঘাতকে আরও জটিল করেছে। সৌদি আরব ও তার মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ইরান হুথিদের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে থাকে। হুথিদের সঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাতকে অনেক সময় বৃহত্তর সৌদি–ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবেও দেখা হয়। তবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে শুধু ইরান–সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করলে সংকটের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রও পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে আরও সামরিক সহায়তা চাইলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের ভূমিকা সরাসরি বড় আকারের নতুন সামরিক অভিযানের পরিবর্তে গোয়েন্দা ও অন্যান্য সহায়তার দিকে বেশি ঝুঁকেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যে যোগাযোগের পথও খোলা রয়েছে। 

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় এবং গভীরতম মূল্য দিতে হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের মানবিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইয়েমেনে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। একই সঙ্গে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। 

সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর এক লাখেরও বেশি মানুষ ইয়েমেনের ভেতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং আরও মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতির দিকে পালানোর চেষ্টা করেছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন হলো—সমাধানের পথ কী?

ইয়েমেনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভবত সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। কারণ কোনো পক্ষ সামরিকভাবে কিছু অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিভাজন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা সংকট থেকেই যাবে। তাই প্রথম প্রয়োজন একটি নতুন, পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য যুদ্ধবিরতি।

প্রথম পর্যায়ে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধ এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলা বন্ধ করার বিষয়ে সমঝোতা হতে পারে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে কোনো পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করলে তা নিরপেক্ষভাবে নথিভুক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা, খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি সরবরাহকে যুদ্ধের বাইরে রাখার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এরপর সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংলাপ পুনরুজ্জীবিত করা যেতে পারে। ওমান ইতোমধ্যে মধ্যস্থতায় ভূমিকা রেখেছে; জাতিসংঘের বিশেষ দূতের উদ্যোগের সঙ্গেও এই প্রক্রিয়াকে সমন্বয় করা যেতে পারে। প্রথমে বন্দি বিনিময়, সীমান্ত নিরাপত্তা, বিমানবন্দর ও বন্দর চালু রাখা এবং বাণিজ্যিক চলাচল স্বাভাবিক করার মতো তুলনামূলকভাবে বাস্তব বিষয়গুলোতে সমঝোতা করা যেতে পারে।

তবে শুধু সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে চুক্তি করলেই ইয়েমেনের সমস্যা শেষ হবে না। ইয়েমেনের অন্যান্য রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক শক্তিকেও আলোচনার টেবিলে আনতে হবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে ক্ষমতা বণ্টন, আঞ্চলিক প্রশাসন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে সমঝোতা করা প্রয়োজন। জাতিসংঘও একটি আলোচনাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ইয়েমেনি-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। 

সৌদি আরবের নিরাপত্তার বিষয়টিও যেকোনো শান্তিচুক্তির কেন্দ্রে থাকতে হবে। হুথিদের কাছ থেকে সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও ইয়েমেনে সামরিক চাপ কমানো এবং রাজনৈতিক আলোচনার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি থাকা দরকার। অর্থাৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হতে হবে পারস্পরিক—একতরফা নয়।

ইরানকেও এই বৃহত্তর শান্তি-প্রক্রিয়ার একটি আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে আলাদা একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপ চালু করে ইয়েমেন, লোহিত সাগর, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির বিস্তার এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ইয়েমেনকে সৌদি–ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা সম্ভব।

লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তার জন্যও একটি পৃথক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ, জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের অধিকার রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। 

সবশেষে, রাজনৈতিক সমাধানের সঙ্গে ইয়েমেনের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে যুক্ত করতে হবে। যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে ইয়েমেনের অর্থনীতি সংঘাত শুরুর পর থেকে অর্ধেকেরও বেশি সংকুচিত হয়েছে এবং দেশটির বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটে রয়েছে। 

তাই একটি কার্যকর শান্তিচুক্তির পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ইয়েমেনের অবকাঠামো পুনর্গঠন, হাসপাতাল ও স্কুল পুনরুদ্ধার, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাস্তুচ্যুত মানুষকে নিজ এলাকায় নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া।

সব মিলিয়ে ইয়েমেনের সংকটের সমাধানকে একটি চার স্তরের শান্তি-প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে—প্রথমে যুদ্ধবিরতি, এরপর সৌদি–হুথি নিরাপত্তা সংলাপ, তারপর ইয়েমেনের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষের অংশগ্রহণে জাতীয় রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সর্বশেষে আন্তর্জাতিক সহায়তায় অর্থনৈতিক পুনর্গঠন। এর পাশাপাশি ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সংলাপ এবং বাব আল-মান্দাবের আন্তর্জাতিক নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ইয়েমেনের সংকটের প্রকৃত সমাধান তাই কোনো পক্ষের সামরিক বিজয়ের মধ্যে নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে, যেখানে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব, হুথিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অন্যান্য ইয়েমেনি শক্তির প্রতিনিধিত্ব এবং সাধারণ মানুষের মানবিক অধিকার—সবগুলো বিষয় একই কাঠামোর মধ্যে স্থান পায়। জাতিসংঘও দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন কমাতে রাজনৈতিক সমাধান, মৌলিক সেবা পুনরুদ্ধার ও জীবিকা পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়েছে। 

বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু আরেকটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং কোটি কোটি ইয়েমেনির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি সংকট। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, সমাধানের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য তত বাড়বে। বিপরীতে, যদি সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার একটি বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো তৈরি করা যায়, তাহলে ইয়েমেনকে ধীরে ধীরে যুদ্ধের রাজনীতি থেকে শান্তি ও পুনর্গঠনের পথে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

Translate