কারখানার সিঁড়িতে উঠতেই দেয়ালে সাঁটানো রয়েছে সাইকেলের ফ্রেম। ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় এলাহি কারবার। কেউ সাইকেলে রং দিচ্ছে, কেউ রিংয়ে স্ক্রু ফুটো করছে, কেউ সংযোগ করছে। বিশাল কর্মযজ্ঞ। একটি সাইকেল প্রস্তুত করতে কত হাত ঘুরে আসতে হয়!
এমন কর্মযজ্ঞ দেখা যায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়। কর্ণফুলী ইপিজেডের করভো সাইকেলস কারখানায়। গত শনিবার এই ইপিজেড ২০ বছর পার করেছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান শেষে ঘুরে দেখা হয় কারভো কোম্পানির সাইকেল কারখানাটি।
করভো সাইকেলস লিমিটেডের প্রোডাক্টশন ম্যানেজার দেব কুমার দাশ (দেবু) বললেন, ‘প্রস্তুত করা সব সাইকেল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বছরে দুই লাখ সাইকেল রপ্তানি করা হয়। এখানে ১০-২০ হাজার থেকে শুরু করে ৫০-৬০ হাজার টাকা দামের সাইকেল তৈরি করা হয়।’ বার্ষিক রপ্তানিমূল্যের বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান। কারখানায় ৪শ শ্রমিক কাজ করেন বলে জানান তিনি।
তবে কর্ণফুলী ইপিজেড সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত করভো সাইকেল লিমিটেড ৬৩ লাখ ৩১ হাজার ৪৯২ ডলারের বাইসাইকেল রপ্তানি করেছে।
পতেঙ্গায় কর্ণফুলী ইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত করভো সাইকেলস লিমিটেড পুরোটায় রপ্তানিনির্ভর। বৈশ্বিক বাজার ও ক্রেতার চাহিদা মতো নানা ধরনের সাইকেল তৈরি করে রপ্তানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ইউরোপ ও আমেরিকা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর রাস্তায় চলছে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা এসব সাইকেল।
করভো সাইকেল লিমিটেড বাইসাইকেলের পাশাপাশি বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য ট্রিডেন্ট সাইকেলস কোম্পানি লিমিটেড নামে আরেকটি কারখানা স্থাপন করেছে।
কারখানার প্রোডাক্টশন ম্যানেজার দেব কুমার দাশ বললেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো রপ্তানি দিয়ে শুরু হয়। এখন আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বেও রপ্তানি করা হয়। এজন্য সাইকেল তৈরিতে মানের বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। সর্বোচ্চমান বজায় রেখে সাইকেল তৈরি করা হয়। সেজন্য বিশ্বের নামী-দামি কোম্পানির কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়।’
জানা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ দেশে বাইসাইকেল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। আর পুরো বিশ্বে বাইসাইকেল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম।
বাংলাদেশের একটি শুল্ক-মুক্ত অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনার ফলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ শুল্কের সুবিধা পাওয়া যায়।
প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম:
কোম্পানির ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা যায়, ২০০৫ সালে একটি শীর্ষস্থানীয় ওইএম (OEM) সাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘কারভো সাইকেলস লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে অবস্থিত নতুন কারখানাটি ২০১১ সালে নির্মিত হয়। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির ক্রয় ও বিক্রয় সংক্রান্ত প্রধান কার্যালয়গুলো তাইওয়ান ও চীনে অবস্থিত।
‘করভো সাইকেলস লিমিটেড’ (Corvo Cycles Ltd) সাইকেল শিল্পের জগতে ২১ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি OEM সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সাইকেল এবং সেগুলোর সাথে মানানসই সব ধরনের আনুষাঙ্গিক বা অ্যাক্সেসরিজ সরবরাহ করতে সক্ষম। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী সম্পূর্ণ কাস্টমাইজড বা বিশেষায়িত সাইকেল তৈরির লক্ষ্যে গ্রাফিক্স, ডিকাল এবং ফ্রেম জ্যামিতির ক্ষেত্রে নিজস্ব ডিজাইন সেবা প্রদান করা হয়।
কী ধরনের সাইকেল তৈরি হয় :
মাউন্টেন বাইক (MTB), বিএমএক্স বাইক (BMX), শিশুদের সাইকেল (Kids Bicycles), শিশুদের জন্য সাধারণ ও হালকা ওজনের বিভিন্ন সাইকেল। রোড বাইক, হাইব্রাইড ও ট্রেকিং বাইক, ক্লাসিক ও সিটি ক্রুজার বাইক, গ্র্যাভেল বাইক।
এছাড়া, এটি একটি OEM (Original Equipment Manufacture) সাইকেল উৎপাদনকারী কারখানা, অর্থাৎ তারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডের চাহিদা ও ডিজাইন অনুযায়ী সাইকেল তৈরি করে দেয়।
চট্টগ্রাম থেকে সাইকেল রপ্তানি :
দেশের বাইরে প্রথম বাইসাইকেল রপ্তানি শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকেই। মালয়েশিয়াভিত্তিক কোম্পানি ‘আলিতা বিডি লিমিটেড’ ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেডে বাইসাইকেল উৎপাদন শুরু করে। ৯৫ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে তৈরি) লেবেলযুক্ত সাইকেল রপ্তানির মধ্য দিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড তুলে ধরে। ২০১২ সাল থেকে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে বাইসাইকেল রপ্তানি করে আসছে করভো সাইকেলস লিমিটেড।
২০০৩ সালে রপ্তানিকারকের তালিকায় যুক্ত হয় দেশি প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ। পরবর্তীসময়ে যুক্ত হয় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপসহ বিভিন্ন দেশীয় কোম্পানি। এভাবে ধীরে ধীরে এই শিল্পের পরিধি বাড়াতে থাকে। বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা ও ভারতসহ ২৯টি দেশে সাইকেল রপ্তানি করা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। তবে মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে প্রতি বছর গড়ে ১০ কোটি ডলারের বাইসাইকেল রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক জানালেন, ‘এই বিশাল রপ্তানি আয়ের্ সিংহভাগই এসেছে বিশ্বমানের প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন বা পণ্যের বৈচিত্র্য থেকে। কেইপিজেড এখন উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত হাবে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোর টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যার, ক্যাম্পিং টেন্ট ও হাই-টেক গিয়ার, বাইসাইকেল, সেফটি জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এখন তৈরি হচ্ছে