প্রায়ই দেখা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতের্থী নিয়মিত অনুপস্থিত থাকছে। বারবার তাগাদা দেওয়া সত্তে ও তারা সহজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে চায় না। মূলত গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে অনুপস্থিতির হার স্কুলের তুলনায় বেশি। যেসকল শিক্ষার্থী কলেজে বেশিরভাগ সময় অনুপস্থিত থাকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তাদের সিংহভাগই মা-বাবাকে সংসারে সাহায্য করার জন্য কিংবা জীবিকার তাগিদে ছোটখাটো চাকরি করে।
অন্যদিকে, কিছু শিক্ষার্থী আছে যারা কলেজে মাঝে মাঝে আসে এবং অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলোতে যথাসময়ে অংশ নেয়। গ্রামীণ জনপদের কলেজগুলোতে শহরের তুলনায় শিক্ষার্থী সংখ্যা এমনিতেই কম। তাই এসব অনিয়মিত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়াও সম্ভব হয় না। কারণ শিক্ষার্থীরা যে জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্লাস করতে আসে, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য! এদের কেউ চাকরি করে, কেউ টিউশনি করে, আবার কেউ মা-বাবাকে কৃষিকাজে সাহায্য করে।
এমতাবস্থায় এ ধরনের শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। পরবর্তীতে এদের মধ্য থেকে অনেকের জন্য উচ্চ পর্যায় থেকে সুপারিশ আসে, যেন তাদের চুড়ান্ত (বোর্ড) পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে অনেক সময় তাদের বোর্ড পরীক্ষার সুযোগও দিতে হয়। কিন্তু এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে তারা চুড়ান্ত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়, যার ফলে সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানের পাসের হার কমে যায়।
এ পর্যায়ে গ্রামীণ জনপদের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। গ্রামাঞ্চলে বিজ্ঞান বিভাগে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। যারা ভর্তি হয়, তারাও নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে না। ফলে গ্রামাঞ্চলের কলেজগুলোতে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার অত্যন্ত কম পরিলক্ষিত হয়। এর অন্যতম কারণ হলো, শহরের মতো গ্রামে প্রাইভেট বা কোচিং পড়ার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। এর বাইরে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েও নিয়মিত ক্লাস না করায় তাদের পড়াশোনায় বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়, যেখানে শিক্ষকদেরও খুব বেশি কিছু করার থাকে না। তবে গ্রামে যারা তুলনামূলক মেধাবী এবং নিয়মিত কলেজে এসে পড়াশোনা চালিয়ে যায়, তারা বোর্ড পরীক্ষায় ঠিকই কৃতিত্বের সাথে পাস করে।
মূলত গ্রামীণ পর্যায়ে এমনও শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা কলেজে কেবল পরীক্ষা দেওয়ার জন্য হাজির হয় এবং বোর্ড পরীক্ষার ফরম পূরণ করে পরীক্ষায় অংশ নেয়। একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকলে সে পাস করবে। এ বিষয়ে শিক্ষকরা নিশ্চয়তা দিতে পারেন। কিন্তু যে শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করেনি অথচ বোর্ড পরীক্ষার অনুমতি পেল, তার পাসের বিষয়ে শিক্ষকরা কখনোই নিশ্চয়তা দিতে পারেন না।
এটা ঠিক যে, শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কলেজে ক্লাস না করলেও বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে পড়ে পাস করে যায়; কিন্তু গ্রামে সে সুযোগ সীমিত হওয়ায় এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা হাতে গোনা।গ্রামাঞ্চলের কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে গভর্নিং বডির সরাসরি সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। কারণ গভর্নিং বডিতে স্থানীয় অভিভাবক প্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি থাকেন। তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা পেলে কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সহজেই বাড়ানো সম্ভব।
শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং গভর্নিং বডির সমন্বিত উদ্যোগে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করা প্রয়োজন। গ্রামীণ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করতে মুঠোফোনে যোগাযোগ এবং অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত কথা বলার কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে মুখ্য। একজন শিক্ষক যখন একজন অভিভাবককে নিয়মিত ফোন করবেন, তখন ওই অভিভাবকের মনে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে এবং তিনি সন্তানকে কলেজে পাঠাতে তাগিদ দেবেন।
তবে এই কাজটি কেবল এক-দুজন শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব নয়। পুরো শিক্ষক টিমকে একসাথে কাজে লাগাতে হবে। কলেজে কয়েকটি টিম গঠন করে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের তালিকা অনুযায়ী তাদের এবং তাদের পরিবারের সাথে নিয়মিত কথা বলতে হবে। এতেও কাজ না হলে শিক্ষকদের উদ্যোগে ‘হোম ভিজিট’বা বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মোটকথা, শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করতে কার্যকর নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে সফল হতে হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গভর্নিং বডিকে একযোগে কাজ করতে হবে।
অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের যেকোনো উপায়ে ক্লাসমুখী করতে পারলে কলেজের চুড়ান্ত ফলাফল নিশ্চিতভাবেই ভালো হবে। অনেক সময় অনিয়মিত থাকার কারণে টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। তারা নিয়মিত কলেজে আসলে হয়তো এভাবে ঝরে পড়ত না। এ বিষয়ে অভিভাবকদেরও দায় রয়েছে। সন্তান নিয়মিত কলেজে যাচ্ছে কি না, ঠিকমতো পড়াশোনা করছে কি না এবং পরীক্ষাগুলোতে অংশ নিচ্ছে