জুমার নমাজ শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে বাসার পথে হাঁটছিলেন দেলোয়ার হোসেন মিন্টু। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা ছেলে আজাদ হোসেন রহিম। বাবা-ছেলের সেই পথচলা যে শেষবারের মতো, তা জানতেন না কেউই। সামনেই রেললাইন। সেই লাইন দিয়ে দ্রুতগতিতে কক্সবাজারের দিকে ছুটে যাচ্ছিল পর্যটক এক্সপ্রেস। হঠাৎ মিন্টুর চোখে পড়ে, একটি শিশু ট্রেনের একেবারে কাছে চলে গেছে। বিপদ বুঝে এক মুহূর্তও ভাবেননি তিনি। নিজের জীবনের কথা ভুলে ছুটে যান শিশুটিকে বাঁচাতে। ঝাঁপিয়ে পড়েন ট্রেনের সামনে। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেনটি চলে যায় তাঁর শরীরের ওপর দিয়ে। রেললাইনে পড়ে থাকে চিরচঞ্চল মানুষটির ছিন্নভিন্ন দেহ। অন্যের শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের তিন শিশুকে বাবাহারা করে চলে গেলেন মিন্টু। এক মুহূর্তেই ওলটপালট হয়ে গেল একটি পরিবার।
স্থানীয় মাদ্রাসার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আজাদের কাছে ঘটনাটি যেন এখনও অবিশ্বাস্য। একটু আগেও যে হাতটি শক্ত করে ধরে হাঁটছিলেন বাবা, সেই মানুষটিই তার চোখের সামনে মুহূর্তে নেই। এদিকে, মিন্টুর বাসায় তখন দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্ত্রী আসমা আক্তার রুবি। মাকে সহযোগিতা করছিল চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় মেয়ে আফরিন সুলতানা রুমি। সঙ্গে ছোট্ট মেয়ে আরজিনা সুলতানা রাইফা। দুই বোন অপেক্ষা করছিল, বাবা আর ভাই ফিরলেই একসঙ্গে খেতে বসবে। কিন্তু আর ফেরা হয়নি মিন্টুর।
ফিরবেন না কোনোদিন। অসময়ে স্বামীকে হারিয়ে আসমা আক্তার রুবির মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। সামনে পড়ে আছে তিন ছোট সন্তান। একদিকে স্বামীকে হারানোর শোক, অন্যদিকে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ-সব মিলিয়ে যেন দিশেহারা তিনি।
জীবন বদলাতে বহু বছর আগে কুয়েতে গিয়েছিলেন দেলোয়ার হোসেন মিন্টু। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে দুই বছর পরই দেশে ফিরতে হয় তাকে। এরপর কিছুদিন গ্রামের বাড়ি ফেনীতে ছিলেন। গত এক যুগ ধরে চট্টগ্রাম নগরের পূর্ব নাসিরাবাদ তুলাতলী এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন। পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান মিন্টুর সেখানে ছিল ছোট্ট একটি দোকান। সেই দোকানের আয়েই কোনোমতে চলত পাঁচ সদস্যের সংসার। হঠাৎ তার মৃত্যুতে সেই ছোট্ট সংসারটিই এখন বিপর্যস্ত। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে স্ত্রী ও তিন সন্তান অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে। মিন্টুর বাড়ি ফেনীর পরশুরামের রতনপুর গ্রামে। গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
আকস্মিক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারানোর পর একেবারেই চুপ হয়ে গেছেন আসমা আক্তার রুবি। স্বজনেরা তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখছেন। মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙলেই আত্মচিৎকার করে বলছেন, ‘আমার তিন সন্তানই ছোট। তাদের কে দেখবে? আমি কীভাবে বাঁচব? শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে দোকানে গিয়েছিল। সেখান থেকেই মসজিদে যায়। একটা বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার স্বামীটা চিরতরে চলে গেল। আমরা এখন কার কাছে যাব?’
মসজিদে ঢোকার আগেই ফোনে মেয়ে আরজিনা সুলতানা রাইফার সঙ্গে কথা হয়েছিল মিন্টুর। সেই কথাটিই এখন মেয়েটির কাছে বাবার শেষ স্মৃতি। কাঁদতে কাঁদতে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া আরজিনা বলে, ‘আজান দিতে দেখেই আমি বাবাকে ফোন দিই। বাবা তখন আমাকে বলে, তোমার ভাইয়া মসজিদে আসার সময় টুপি আনেনি কেন। আমি ভাবিনি-এটাই হবে আমার বাবার সঙ্গে শেষ কথা।’
অন্যের শিশুর জন্য জীবন উৎসর্গ করা মিন্টুর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দাবি উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তার বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন অনেকে। ‘প্রিয় চট্টগ্রাম’ ও ‘বীর চট্টলা’ নামের দুটি ফেসবুক পেজে এই বিষয়ে দেওয়া পোস্টও ব্যাপক ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে মিন্টুর পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথা তুলে ধরে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
মাহফুজুর রহমান বাবুল নামের একজন লেখেন, ‘মিন্টু ভাই খুব ভালো মনের একজন মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভালো না। সবাই মিলে অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো দরকার।’
নজরুল ইসলাম টিপু নামের আরেক তরুণ লেখেন, ‘অন্যের শিশুর জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেছেন মিন্টু ভাই। পুরো পরিবারটি মিন্টু ভাইয়ের ছোট্ট দোকানের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন তিনি নেই। বিত্তবানদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের জন্য কিছু করা হোক।’
মিন্টু নেই। আছে তার তিন সন্তান-বাবার অপেক্ষা যাদের আর কোনোদিন শেষ হবে না। অন্যের শিশুকে বাঁচাতে জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি। এবার তার তিন শিশুর পাশে দাঁড়ানোর পালা সবার, রাষ্ট্রের!