বৃহস্পতিবার ১৬ই জুলাই, ২০২৬

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড মহারণ কেন শুধু ফুটবল নয়

ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই কখনোই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। যেখানে প্রতিটি বাঁশি, প্রতিটি গোল আর প্রতিটি সিদ্ধান্ত নতুন করে লিখে দেয় বিশ্বকাপের ইতিহাস।

 

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দলের মধ্যে থাকা এই দুই পরাশক্তি যখন আজ রাত ১টায় মুখোমুখি হবে, তখন সেটি হবে প্রায় ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়।

 

এই লড়াই মানেই ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ডের দুঃস্বপ্ন এবং চার বছর পর তার প্রতিশোধের গল্প। আবার আছে ওয়েম্বলির সেই বিতর্কিত ম্যাচ, যার পর ফুটবলে চালু হয় লাল ও হলুদ কার্ড।

 

আশির দশক থেকে এই দ্বৈরথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপও। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার যুদ্ধ দুই দেশের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও আরও তীব্র করে তোলে। ফলে মাঠের ৯০ মিনিট যেন কেবল ফুটবল নয়, দুই জাতির আবেগ ও ইতিহাসেরও প্রতিফলন।

 

চলুন ফিরে দেখা যাক ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা দ্বৈরথের কয়েকটি স্মরণীয় অধ্যায়।

১৯৬৬: ইংল্যান্ড ১–০ আর্জেন্টিনা; যে ম্যাচ বদলে দিয়েছিল ফুটবলের নিয়ম

১৯৬২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ড সহজেই জিতেছিল ৩-১ ব্যবধানে। কিন্তু চার বছর পর লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে দুই দলের সাক্ষাৎ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচে পরিণত হয়।

 

ইংল্যান্ডের কোচ আলফ র‍্যামজি ম্যাচ শেষে ক্ষুব্ধ হয়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের পশু বলে মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় এই ম্যাচ পরিচিত হয়ে যায় এল রোবো দেল সিগলো অর্থাৎ শতাব্দীর ডাকাতি নামে। কারণ, অধিনায়ক আন্তোনিও রাট্টিনের বিতর্কিত লাল কার্ড এবং জিওফ হার্স্টের জয়সূচক গোল অফসাইড ছিল বলে দাবি করেছিল আর্জেন্টিনা।

 

রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন ববি চার্লটন ও হার্স্টকে ফাউল করার অভিযোগে রাট্টিনকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি তা মানতে অস্বীকৃতি জানান।

 

শেষ পর্যন্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তার সহায়তায় মাঠ ছাড়লেও যাওয়ার আগে তিনি রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্য সংরক্ষিত লাল কার্পেটে বসে প্রতিবাদ জানান।

 

এই ঘটনাই পরবর্তীতে ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। যাতে ভাষাগত বিভ্রান্তি ছাড়াই রেফারির সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে জানানো যায়।

 

ম্যাচ শেষে উত্তেজনা আরও বাড়ে। আর্জেন্টিনার রবার্তো ফেরেরো রেফারিকে ধাক্কা দেন, এরমিন্দো ওনেগা ফিফার সহসভাপতি হ্যারি ক্যাভানের মুখে থুতু নিক্ষেপ করেন। দুজনই তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পান। এমনকি এক আর্জেন্টাইন ফুটবলার স্টেডিয়ামের টানেলেই প্রস্রাব করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।

 

১৯৮৬: আর্জেন্টিনা ২–১ ইংল্যান্ড; ‘হ্যান্ড অব গড’-এর জন্ম

ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা দ্বৈরথের সবচেয়ে বিখ্যাত মুহূর্ত নিঃসন্দেহে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল।

 

মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৫১ মিনিটে ডিয়েগো ম্যারাডোনা হাত দিয়ে বল জালে পাঠালেও রেফারির চোখ এড়িয়ে যায় ঘটনাটি। গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়।

 

পরে সেই গোলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘একটু ছিল ম্যারাডোনার মাথা, আর একটু ছিল ঈশ্বরের হাত।’

 

এই একটি বাক্যই সৃষ্টি করে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত কিংবদন্তিগুলোর একটি, ‘হ্যান্ড অব গড।’

 

কিন্তু নাটক সেখানেই শেষ হয়নি। মাত্র কয়েক মিনিট পর ম্যারাডোনা নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে ইংল্যান্ডের একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এমন এক গোল করেন, যেটিকে এখনও অনেকেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোল বলে মনে করেন।

 

১৯৯৮: আর্জেন্টিনা ২–২ ইংল্যান্ড (পেনাল্টিতে ৪–৩); বেকহ্যাম বনাম সিমিওনে

 

১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যাম ছিলেন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় তারকা। কিন্তু শেষ ষোলোর সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখে রাতারাতি নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত হন তিনি।

 

পরদিন ইংল্যান্ডের সংবাদপত্রের শিরোনামে লেখা হয়েছিল, ‘১০ জন বীর সিংহ, একজন নির্বোধ ছেলে।’

 

প্রায় এক ঘণ্টা ১০ জন নিয়ে খেলায় ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়।

 

পরে বেকহ্যাম নিজেই স্বীকার করেন, সেই লাল কার্ড তার পুরো ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিজীবনকে বদলে দিয়েছিল।

 

২০০২: ইংল্যান্ড ১–০ আর্জেন্টিনা; প্রতিশোধ বেকহ্যামের

 

১৯৮৬ ও ১৯৯৮-দুই বিশ্বকাপেই আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যাওয়া ইংল্যান্ড ২০০২ সালে যেন নতুন হিসাব মেলাতে নামে।

 

জাপানের সাপ্পোরোতে ম্যাচের ৪৪ মিনিটে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। মাইকেল ওয়েনকে ফাউল করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মাউরিসিও পোচেত্তিনোর বিরুদ্ধে। যদিও সিদ্ধান্তটি ছিল বিতর্কিত।

 

স্পটকিক নিতে এগিয়ে আসেন ডেভিড বেকহ্যাম। চার বছর আগের সেই লাল কার্ড, সমালোচনা আর অপমান, সবকিছুর জবাব যেন এক শটে দিয়ে দেন তিনি। গোল করে ইংল্যান্ডকে এনে দেন ১-০ ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয়।

 

সেই গোল শুধু তিন পয়েন্ট বা একটি জয় ছিল না; এটি ছিল একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত মুক্তি এবং প্রতিশোধের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি।

Translate