বুধবার ১লা জুলাই, ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দর: গায়েব হয়েছিল ফেব্রিক্স ভর্তি, মিললো খালি কন্টেইনার

চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকার কাপড়ভর্তি একটি কন্টেইনার গায়েব হয়। ঠিক কোন সময়ে কখন কন্টেইনারটি গায়েব হয়েছে তা জানে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। ধারণা করা হচ্ছে গত বছরের ৪ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২ এপ্রিলের মধ্যবর্তী যে কোন সময় কন্টেইনারটি গায়েব হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের হবার পর দশমাসের মাথায় ৪০ ফুট দীর্ঘ খালি কন্টেইনারটি উদ্ধার করে বন্দর থানা পুলিশ। তবে কন্টেইনারভর্তি কাপড়ের হদিস মেলেনি। এরপর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যবর্তী সময়ে কাপড় বোঝাই আরো একটি কন্টেইটার গায়েবের ঘটনা ঘটে। সেটির খোঁজ মেলেনি এখনো।

বন্দর থানার পরিদর্শক (ওসি) আবদুর রহিম জানান, কাপড়ভর্তি কন্টেইনার গায়েবের ঘটনায় গত ৭ এপ্রিল থানায় একটি মামলা দায়ের করে বন্দর কৃর্তপক্ষ। বন্দরের ইয়ার্ড থেকে কাপড়ভর্তি কন্টেইনার গায়েবের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে যে ইয়ার্ড থেকে কন্টেইনারটি গায়েব হয়েছে সেই ইয়ার্ডের ইনচার্জ মিজানুর রহমান ও ক্রেন অপারেটর আবু সুফিয়ানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাছাড়া যে লং ভ্যাহিকেলে কন্টেইনারটি বন্দর থেকে বের করা হয়েছে সেই ভ্যাহিকেলের হেলপার রুবেলকে ঢাকার আশুলিয়া থেকে এবং দুলালকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গায়েব হওয়া আরো একটি কন্টেইনার রয়েছে।

সেটির বিষয়েও তদন্ত চলছে। ওসি রহিম বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত ১৪ জুন হালিশহর আব্বাস পাড়ার গলাচিপা এলাকা থেকে খালি কন্টেইনারটি উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত আরো এক ব্যক্তি পলাতক রয়েছে। তাকে পাওয়া গেলে পণ্যগুলোর গন্তব্য সম্পর্কে জানা যাবে।

পণ্যভর্তি কন্টেইনার গায়েবের ঘটনায় বন্দর থানায় মামলাটি দায়ের করেন বন্দরের জে আর ইয়ার্ডের পরিবহন পরিদর্শক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঢাকার গাজিপুরের মুয়াজ উদ্দিন টেক্সটাইল নামে একটি প্রতিষ্ঠান চায়না থেকে কন্টেইনারভর্তি ফেব্রিক্স আমদানি করেন। কন্টেইটারটি গত বছরের ৪ আগস্ট বার্থ অপারেটর বশির আহম্মদের মাধ্যমে বন্দরের জেআর ইয়ার্ডে রাখা হয়। চলতি বছরের ২ এপ্রিল কন্টেইটারটি কায়িক পরীক্ষা করার পর দ্রæত ডেলিভারি নেয়ার জন্য জেআর ইয়ার্ডের এপ্রেইজ ক্লার্কের সাথে যোগাযোগ করেন সিএন্ডএফ এজেন্ট এস জামান এন্ড ব্রাদার্স (লি.)। দিনভর খোঁজাখুজি করে কন্টেইনারটির হদিস মেলেনি। পরে ডেলিভারি এসাইন্টমেন্ট বাতিল করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে গত বছরের ৪ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২ এপ্রিলের মধ্যবর্তী যে কোন সময় কন্টেইনারটি গায়েব হয়েছে। কন্টেইনার গায়েবের ঘটনা এখানেই শেষ নয়। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যবর্তী সময়ে কাপড় বোঝাই আরো একটি কন্টেইটার গায়েবের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায়ও বন্দর থানায় মামলা দায়ের করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গায়েব হওয়া কন্টেইনারভর্তি কাপড়ের বাজার মূল্য আনুমানিক ৮০ লাখ টাকা। কাপড়গুলো আমদানি করেছিল ঢাকার খিলক্ষেত সুপার মার্কেটের ফাহিম অ্যাটায়ার এন্ড কম্পোসিট লি. নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ফাহিম অ্যাটায়ার এন্ড কম্পোসিট লি. চীন থেকে ফ্রেবিক্স পণ্যবাহী ৪০ ফুট দীর্ঘ একটি কন্টেইনার (কন্টেইনার নং- KOCU-৪৮২৯৩৯৯) আমদানি করে। কন্টেইনারটি চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি টার্মিনাল অপারেটর মেসার্স সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের মধ্যামে জাহাজ থেকে ডিসচার্জ করা হয়। রাখা হয় চিটাগং কন্টেইনার টার্মিনালে (সিসিটি)। পণ্যবাহী কন্টেইনারটি গত ২৮ এপ্রিল কাস্টমসের পণ্য যাচাইয়ের জন্য এসাইন্টমেন্টভুক্ত (কন্টেইনার নামানোর অনুমতি) ছিল।

কিন্তু সিসিটি ইয়ার্ডের ডায়েরি থেকে জানা যায় কন্টেইনারটির অবস্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কন্টেইনারের অবস্থান জানার জন্য গত ৬ মে টার্মিনাল অপারেটর মেসার্স সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেডকে চিঠি দেয়া হয়। গত ১০ মে সাইফ পাওয়ার টেক বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানান, গত ২১ জানুয়ারি কন্টেইনারটি জাহাজ থেকে নামিয়ে সিসিটি ইয়ার্ডে রাখা হয়। গত ১৭ মার্চ অনডেট অনচেসিস (দ্রুত খালাস প্রক্রিয়া) ডেলিভারির জন্য নির্ধারণ করা হয়। কন্টেইনারটি চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমে (টিওএস) অনচেসিস হিসাবে ডেলিভারি দেওয়া হয়। যা টিওএস এ সংরক্ষিত আছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেকের চিঠি পাবার পর কন্টেইনারটির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। মামলার বাদী হামিদুর রহমান বলেন, যে অন- ডেট, অন চেসিস এসাইন্টমেন্টের ৫০ নম্বর ক্রমিকের কপিতে থাকা সৈয়দ মোহাম্মদ হামিদুর রহমান, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (সিসি), সিসিটি ও এনসিটি ইয়ার্ড, চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি নামের সিলের স্থলে সৈয়দ মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (সিসি) সিসিটি এন্ড এনসিটি ইয়ার্ড, চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি উল্লেখ আছে। ডকুমেন্টে থাকা স্বাক্ষর ও সিলটি আমার নয়। তারা সব কাগজপত্র ও স্বাক্ষর জাল করে কন্টেইনারটি বন্দর থেকে বের করে নিয়ে গেছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, অন- ডেট ও অন চেসিস এসাইন্টমেন্টের কপিতে থাকা পরিবহন পরিদর্শকের স্থলে থাকা টার্মিনাল ম্যানেজার দপ্তর এফসিএল পরিবহন পরিদর্শক মো. শফিকুল ইসলাম ও প্রিপারড বাইয়ের স্থলে থাকা উচ্চমান বহিঃসহকারী এমএইচ সিরাজী স্বাক্ষরও তাদের নয়। কাগজপত্রে থাকা সিল স্বাক্ষরও গড়মিল রয়েছে।

টিওএস সিস্টেম চেক করে দেখা যায়, বন্দরের এফসিএল শাখার কর্মচারী মোকাদ্দেস হোসেন টিওএস সিস্টেমের আইডি পাসওয়ার্ড অবৈধভাবে ব্যবহার করে চলতি বছরের ১৭ মার্চ রাত আনুমানিক দুইটা ৫৪ মিনিটে কন্টেইনারটি তথ্য টিওএস সিস্টেমে প্রবেশ করায়। একই সময়ে কন্টেইনারটি টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের ইক্যুইপমেন্ট অপারেটরের সাহায্যে নামানো হয়। পরে তারা কন্টেইনারটি বন্দরের গেট দিয়ে বাইরে বের করে নিয়ে যায়। ঠিক কয়টার সময় কন্টেইনারটি বন্দর থেকে বের করা হয়েছে তা জানেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বন্দর থানার পরিদর্শক (ওসি) আবদুর রহিম জানান, সিসিটি ইয়ার্ড থেকে কাপড়ভর্তি একটি কন্টেইনার পাচার হওয়া সংক্রান্ত একটি মামলা দায়ের করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পণ্যগুলো কীভাবে বন্দরের বাইরে গেলো এ ঘটনায় কারা জড়িত সবকিছুই তদন্ত করা হচ্ছে।

Translate