লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের ৮৫ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১১ বছর বয়সি দুই শিশুকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ভারী কংক্রিটের নিচে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আলাদা দুটি স্থান থেকে তাদের উদ্ধার করেন উদ্ধারকর্মীরা।
প্রথম উদ্ধার হওয়া শিশুটির নাম মোইসেস। কলম্বিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের সহায়তায় উদ্ধারকারীরা শনিবার (২৭ জুন) প্রায় ছয় ঘণ্টার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সূক্ষ্ম অভিযানের পর তাকে প্রায় তিন মিটার গভীর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে টেনে তোলেন। তীব্র রোদ থেকে চোখ রক্ষা করতে কাপড় দিয়ে চোখ ঢাকা অবস্থায় তাকে যখন বের করা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত উদ্ধারকর্মীরা হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন।
তবে রয়টার্স জানিয়েছে, মোইসেসকে জীবিত পাওয়া গেলেও তার পাশেই তার মা ও বোনের মরদেহ মিলেছে। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ কারাবালেদা শহর থেকে একই বয়সি আরও একটি ছেলেকে স্ট্রেচারে করে ধ্বংসস্তূপ থেকে নামিয়ে আনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) শেয়ার করে একে ভেনিজুয়েলার জন্য একটি ‘নতুন আশা’ বলে বর্ণনা করেন।
গত বুধবার (২৪ জুন) মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভেনিজুয়েলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১,৪৩০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। ধসে পড়া শত শত ভবনের নিচে এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। প্রথম ভূমিকম্পের পর ৮৫ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও উদ্ধারকারীরা আশা ছাড়ছেন না। তাদের মতে, ধ্বংসস্তূপের নিচে যদি কোনোভাবে পানি ও খাবারের উৎস থাকে, তবে মানুষের পক্ষে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকা সম্ভব। অনেক পরিবার ভারী যন্ত্রপাতির অপেক্ষা না করে প্রিয়জনদের খোঁজে খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরা। সেখানে ক্রমাগত আফটারশক বা মৃদু ভূকম্পনের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ধসে পড়ার ভয়ে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে গাড়ি, বিমানবন্দর কিংবা গলফ কোর্সে তাঁবু খাটিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। কারাবালেদার একটি সুপরিচিত গলফ কোর্স এখন জরুরি উদ্ধারকাজের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে অস্থায়ী হাসপাতাল, ত্রাণ কেন্দ্র এবং হেলিকপ্টার ল্যান্ডিং প্যাড তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে মেক্সিকো, স্পেন, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৩৯টি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যে ভেনিজুয়েলায় পৌঁছেছে। প্রায় ২,০০০ উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত কুকুর এবং আধুনিক ‘মাইক্রো ড্রোন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধসে পড়া ভবনগুলোর ভেতরে জীবিত মানুষদের সন্ধান চালানো হচ্ছে।
যদিও দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, কিছু কিছু জায়গায় সরকারি উদ্ধার তৎপরতা এখনও বেশ ধীরগতির। তবে প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এই ভয়াবহ দুর্যোগে কোনো পরিবার বা ব্যক্তিকে একা ছেড়ে দেওয়া হবে না এবং আন্তর্জাতিক সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের চেষ্টা চলছে।
সূত্র: বিবিসি।