চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার ঘনত্ব পরিমাপের সরকারি জরিপে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, নগরীতে এডিস মশার লার্ভা বা ছানার উপস্থিতির হার স্বাভাবিক ঝুঁকিসীমার চেয়ে তিন গুণেরও বেশি। বর্ষার শুরুতেই মশার এই উদ্বেগজনক বংশবৃদ্ধি নগরজুড়ে ডেঙ্গু ‘মহামারির’ আশঙ্কা তৈরি করেছে।
গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরে দাখিল করা এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে প্রতিবেদন দাখিল প্রসঙ্গে’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়িতে পরিচালিত জরিপের বিস্তারিত উপাত্ত তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত মোট ১১ দিন ব্যাপী এই জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, জরিপকৃত ৩৭০টি বাড়ির মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এবং ঘরে-বাইরে থাকা ৩৪৫টি পানির পাত্রের (কনটেইনার) মধ্যে ১১৪টি পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত মশার লার্ভার উপস্থিতি ও ঘনত্ব বোঝার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে তিনটি সূচক ব্যবহার করা হয়, যার প্রত্যেকটিতেই চট্টগ্রামের চিত্র ভয়াবহ। প্রথমত, ‘কনটেইনার ইনডেক্স’ (পাত্রের সূচক), অর্থাৎ পরীক্ষা করা পাত্রগুলোর মধ্যে কত শতাংশে লার্ভা আছে; চট্টগ্রামে তা পাওয়া গেছে ৩৩.০৪ শতাংশ। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, এই হার ১০ শতাংশের বেশি হলেই তাকে ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি ধরা হয়। সেই হিসাবে চট্টগ্রামে মশার লার্ভার উপস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি।
দ্বিতীয়ত, ‘হাউস ইনডেক্স’ (বাড়ির সূচক), অর্থাৎ প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে কতটি বাড়িতে লার্ভা আছে; চট্টগ্রামে এই হার ২৬.৭৬ শতাংশ, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা থাকার কথা ৫ শতাংশের নিচে (অর্থাৎ ৫ গুণেরও বেশি বাড়িতে লার্ভা আছে)। তৃতীয়ত, ‘ব্রেটো ইনডেক্স’ (পাত্র ও বাড়ির অনুপাত সূচক) পাওয়া গেছে ৩০.৮১ শতাংশ, যার স্বাভাবিক সীমা ২০ শতাংশের নিচে থাকার কথা। জরিপে প্রাপ্ত লার্ভার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক ‘এডিস ইজিপ্টাই’ এবং ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
এদিকে, মাঠপর্যায়ের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য বিভাগ চসিকের ৮টি ওয়ার্ডকে এডিস মশার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ওয়ার্ডগুলো হলো- উত্তর কাট্টলী (ওয়ার্ড-১০), পাঁচলাইশ (ওয়ার্ড-৩), জালালাবাদ (ওয়ার্ড-২), পশ্চিম বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৭), দক্ষিণ বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৯), দক্ষিণ হালিশহর (ওয়ার্ড-৩৯), পাথরঘাটা (ওয়ার্ড-৩৪) এবং আন্দরকিল্লা (ওয়ার্ড-৩২)।
জরিপের বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, জরিপের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সুপারিশসহ আমরা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা বরাবর চিঠি পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে যেন তারা সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞ জরিপ দল ৪ দফা জরুরি সুপারিশ পেশ করেছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে- কোনো পাত্র বা আঙিনায় তিন দিনের বেশি জমে থাকা পানি দূর করা, চসিকের উদ্যোগে নগরবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্লাস্টিক পাত্র ও বর্জ্য নির্মূল করা এবং বহুতল ও নির্মাণাধীন ভবনে বিশেষ নজরদারি চালানো। এছাড়া মশার ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করার পাশাপাশি উড়ন্ত বা পূর্ণাঙ্গ মশা মারতে সূর্যোদয়ের পরপরই এবং সূর্যাস্তের ঠিক পূর্বে যথাযথ নিয়মে মশক নিধনের ওষুধ স্প্রে করা এবং ব্যবহৃত কীটনাশকের সঠিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
জরিপ দলের প্রতিবেদনে লার্ভা পাওয়ার প্রধান উৎস হিসেবে বাসাবাড়ির প্লাস্টিক সামগ্রী (বালতি, মগ, ড্রাম, টব), মাটির পাত্র এবং পানির ট্যাংকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, নির্মাণাধীন ভবন ও আধুনিক বহুতল অট্টালিকার আন্ডারগ্রাউন্ড, ফ্ল্যাট ফ্লোর, লিফট হোল, ককশিট ও টিনের ক্যানের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত ময়লা ফেলার ভ্যান গাড়িতেও প্রচুর পরিমাণে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি মিলেছে।
যৌথ এই উদ্যোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এ জরিপ পরিচালিত হয়। জরিপের ফলাফলের বিষয়টি নিয়ে চসিক, জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরসহ যৌথভাবে ডেঙ্গু মোকাবেলায় সবার সহযোগিতায় সমন্বিত উদ্যোগে কাজ করা হবে।
প্রসঙ্গত : চার সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কারিগরি দল মাঠপর্যায়ে এই জরিপ পরিচালনা করেন। জরিপ দলে ছিলেন- বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের বিভাগীয় কীটতত্ত¡বিদ মো. মফিজুল হক শাহ (দলনেতা) ও এন্টোমোলজিক্যাল টেকনিশিয়ান মো. মাকসুদুর রহমান এবং চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন অফিসের ভারপ্রাপ্ত জেলা কীটতত্ত¡বিদ মঈন উদ্দীন ও এন্টোমোলজিক্যাল টেকনিশিয়ান রিয়াজ উদ্দিন।