রবিবার ২১শে জুন, ২০২৬

একজনের স্মৃতিতে বাবা অন্যজন চিনবে ছবিতে!

মোটরসাইকেলের ওপর বসে আছে বাবা আর মেয়ে। দুজনের মাথায় হেলমেট। স্বচ্ছ কাঁচের আড়াল থেকেও বেরিয়ে আসছে দুজনের মিষ্টি হাসি। ছবিটি ফেসবুকে দিয়েছিলেন ইয়াসিন আরিফ। হয়তো তখন ভাবেননি, একদিন এই ছবিটাই হয়ে উঠবে তার মেয়ের কাছে বাবাকে মনে রাখার সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি। কারণ এভাবে আর কোনোদিন বাবা-মেয়ের একসঙ্গে ছবি তোলা হবে না। কেননা বাবার সেই প্রাণখোলা হাসি চিরতরে মুছে গেছে, মেয়ের মুখ মলিন করে!

জাইসা তাও অন্তত বাবার সঙ্গে কিছু স্মৃতি জমাতে পেরেছে। বাবার কাঁধে চড়া,মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো, কিংবা আদরে ভরা কিছু মুহূর্ত। কিন্তু পাঁচ মাস পর পৃথিবীর আলো দেখতে আসা তার অনাগত ভাই বা বোনের ভাগ্যে সেটুকুও নেই। সেই শিশুর কাছে বাবা মানে হবে শুধু কয়েকটি ছবি, আর মানুষের মুখে মুখে ফেরা একজন ভালো মানুষের গল্প।

চান্দগাঁওয়ের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন ইয়াসিন আরিফ। কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে একটু অবসর পেলেই বেরিয়ে পড়তেন মোটরসাইকেল নিয়ে। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো ছিল তার নেশা। তবে তিনি ছিলেন সচেতন বাইকার। ভালোমানের হেলমেট ব্যবহার করতেন, শরীরজুড়েও থাকত নিরাপত্তা সরঞ্জাম। কিন্তু জীবন তো সব হিসাব মেনে চলে না। অতিপরিচিত সেই গানের কলির মতোই-‘ডাক যে হঠাৎ আসতে পারে যেতে ঠিকানায়, এক মিনিটের নাই ভরসা রঙের দুনিয়ায়।’

গত বৃহস্পতিবার রাতে এক বন্ধুকে নিয়ে ইয়াসিন গিয়েছিলেন মাওয়াঘাটে। সেখানে ইলিশের স্বাদ নিয়ে শুক্রবার সকালে ফেরার পথে কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায় ঘটে দুর্ঘটনা। একটি বাসকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ উল্টো দিক থেকে সামনে চলে আসে একটি রিকশা। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের পিলারের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে তার মোটরসাইকেলের। ছিটকে পড়ে আরেকটি পিলারের ওপর আঘাত পান ইয়াসিন। মাথায় ছিল প্রায় দশ হাজার টাকা দামের হেলমেট। তবুও গুরুতর আঘাত এড়ানো যায়নি। স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মাত্র ৩৫ বছরের আশপাশেই থেমে গেল একটি দুরন্ত জীবনের পথচলা।

ইয়াসিনের বাড়ি বাঁশখালীর চাম্বল এলাকায় হলেও বেড়ে ওঠা নগরের বালুচরায়। অক্সিজেন এলাকায় মা-বাবা, স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ছোট্ট এক সুখের সংসার।

ভগ্নিপতি মো. মামুনুর রশিদ ইয়াসিনের কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন। বুজে আসা গলায় এই তরুণ বললেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত কিংবা অফিস ছুটির রাত মানেই ছিল ভাইয়ার মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া। কখনো বলে, কখনো না বলেই। পরিবারের সবাই বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই নিতেন। কেননা বাইকের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অন্যরকম। অফিস থেকে ফিরে বাসায় ওঠার আগেও আধাঘণ্টা ধরে বাইকের পরিচর্যা করতেন। যেন সেটি ছিল তার আরেক সন্তান।’

কথা ফুরায় না মামুনুরের। বলেন, ‘শুক্রবার দুপুরে বাসায় ফেরার কথা ছিল ভাইয়ার। প্রতিবারের মতো হয়তো মেয়ের জন্য কিছু খাবারও নিয়ে আসতেন। ভাবিও অপেক্ষা করছিলেন একসঙ্গে খাবার খাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর শেষ হয়নি। হবে না কোনোদিনও।’

ইয়াসিন শুধু পরিবারের কাছেই নয়, বাইকার সমাজেও ছিলেন পরিচিত মুখ। ‘বিবি-স্কোয়াড’ নামে একটি ফেসবুকভিত্তিক বাইকার গ্রুপ চালু করেছিলেন তিনি। ছুটি পেলেই সেই দলের সদস্যদের নিয়ে চষে বেড়াতেন সারা দেশ।

দলের সদস্য মেহেদী হাসান খুলে দিলেন স্মৃতির দরজা। বলেন, ‘প্রায় ১৮ বছর ধরে মোটরসাইকেল চালাতেন ইয়াসিন ভাই। সেদিন এক আড্ডায় বলেছিলেন জীবনে সাত লাখ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়েছি। ভাইয়া নিরাপত্তার ব্যাপারে সবসময় সচেতন ছিলেন। তাই মাঝে মাঝে দুর্ঘটনায় পড়লেও আমরা খুব একটা ভয় পেতাম না। কিন্তু এবার যে দুর্ঘটনা ভাইকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবে-সেটা কখনো ভাবিনি।’

একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেয়নি। কদিন আগে বাবাকে হারানো মা জাহেদা বেগম এবার হারালেন বড় আদরের ধনকে। দুই বোন হারালেন বহু আবদার পূরণের অবলম্বন বড় ভাইকে। আর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ইসমত আরা জেকি হারালেন জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আর বন্ধুরা হারালেন সুখ-দুঃখের এক অন্তঃপ্রাণ সাথীকে।

চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজে পড়ার সময় শুরু হয়েছিল ইয়াসিন ও ইসমত আরা জেকির ভালোবাসা। সেই সম্পর্ক পূর্ণতা পেয়েছিল আট বছর আগে বিয়ের মাধ্যমে। স্বামীর জন্য অপেক্ষা না করে কখনো খাবার খেতেন না জেকি। শুক্রবারও অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু যে মানুষটির জন্য অপেক্ষা, তিনি ফিরলেন না আর। ফিরলেন স্ট্রেচারে শুয়ে, এম্বুলেন্সে চেপে!

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। পৃথিবীর বহু সন্তান বাবার হাত ধরে ছবি তুলবে, ঘুরতে যাবে, কেউ হয়তো বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলবে-ভালোবাসি। কিন্তু তারই ঠিক দুদিন আগে বাবা হারানো জাইসা বড় হবে বাবার কিছু ম্লান হয়ে আসা স্মৃতি আঁকড়ে ধরে। আর পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় থাকা তার ভাই কিংবা বোন বড় হবে শুধু ছবির মানুষটিকে চিনে।

কিছুদিন আগে নিজের একটি বাইক রাইডের ভিডিও ফেসবুকে দিয়েছিলেন ইয়াসিন। সেটির ওপরে তিনি লিখেছিলেন, ‘একদিন তুমি আমাকে খুঁজবে, কিন্তু তখন আমি থাকব শুধু স্মৃতি হয়ে।’ ইয়াসিনের সেই কথাগুলো জাইসা ও তার অনাগত ভাই অথবা বোনের জীবনে সত্যি হয়ে গেলো, বড় নির্মমভাবে! তারা বাবাকে খুঁজবে ঠিকই, বাবা বলে ডাকতে পারবে না কোনোদিন!

Translate