ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে ৯০ মিনিট পার হয়ে গেছে। স্কোরবোর্ড ০-০। হাজার হাজার দর্শক ড্রয়ের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক তখনই উইলফ্রেড সিঙ্গো গভীর থেকে গর্জন করে ছুটলেন, ক্লান্তির লেশমাত্র নেই তার পায়ে। বল পেলেন আমাদ দিয়ালো। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই উইঙ্গার একটুও দ্বিধা করলেন না, শরীর খুলে ঠান্ডা সাইড ফুটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জড়ালেন সাইড নেটিংয়ে।
আইভরি কোস্টের বেঞ্চ পুরোটাই মাঠে ঢুকে পড়লো। ১২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে প্রথম ম্যাচেই জয়, এর চেয়ে ভালো শুরু আর কী হতে পারে।
প্রথমার্ধ: ক্রসবার, কার্ড আর চাপের খেলা
শুরু থেকেই ম্যাচটা রুক্ষ ও টানটান। মোইসেস কাইসেদো ও পেদ্রো ভিতের মিডফিল্ড জুটি আইভরি কোস্টকে বারবার চাপে ফেললো, ইকুয়েডরের হাই প্রেস কার্যকর ছিল।
কিন্তু গোল পেলো না ইকুয়েডর, দুইবার ক্রসবার তাদের স্বপ্ন ভাঙলো। জন ইয়েবোয়া দূর থেকে দর্শনীয় শট মারলেন, বার কাঁপলো। এরপর অ্যালান মিন্ডাও বারে আঘাত করলেন। এনার ভালেন্সিয়ার ফ্রি-কিক হেড গেলো ওপর দিয়ে।
অন্যদিকে আইভরি কোস্টের ইয়ান দিওমান্দে বারবার ইকুয়েডরের রক্ষণে অস্বস্তি তৈরি করলেন।
হলুদ কার্ডের বন্যা বইলো আইভরি কোস্ট শিবিরে। সেকো ফোফানা (২৭’), ফ্র্যাঙ্ক কেসিও (৩৭’), গুয়েলা দুয়ে (৩৯’)— বিরতির আগেই তিনটি হলুদ কার্ড। দ্বিতীয়ার্ধে এই তিনজনের ওপর চাপ ছিল প্রচণ্ড।
বিরতিতে ০-০।
দ্বিতীয়ার্ধ: সিঙ্গোর প্রবেশ, আমাদের বিস্ফোরণ
বিরতির পর গুয়েলা দুয়েকে তুলে নিয়ে উইলফ্রেড সিঙ্গোকে নামালেন কোচ এমেরসে ফাই। সেই বদলিই হলো ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট।
সিঙ্গো ডান দিকে নামতেই আইভরি কোস্টের আক্রমণে নতুন গতি এলো। ৯০ মিনিটে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, সিঙ্গোর ক্লান্তিহীন রান থেকে বল পেলেন আমাদ, বাকিটা ইতিহাস।
বিবিসি ওয়ানে সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার স্টিফেন ওয়ার্নক বললেন, “৯০ মিনিটেও সিঙ্গোকে এতটুকু ক্লান্ত দেখাচ্ছিল না। ইকুয়েডর পিছু হটলো, আর সে এগিয়ে গেলো। আমাদ শরীর একটু খুললেন, গ্যাপ তৈরি হলো, গোলরক্ষক কিছুই করতে পারলেন না।”
বিবিসি রেডিওতে সাবেক নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার এফান একোকু যোগ করলেন, “আইভরি কোস্টের খেলোয়াড়রা ম্যাচের শেষে এসেও একই তেজে ছুটছেন— এই অ্যাথলেটিসিজমই পার্থক্য গড়লো।”
সাত মিনিট অতিরিক্ত সময় খেলা হলো। ইকুয়েডর মরিয়া হয়ে চেষ্টা করলো, কিন্তু এবার সিঙ্গো নিজেই রক্ষণে ফিরে বিপজ্জনক একটি ক্রস হেডে সরিয়ে দিলেন। আক্রমণে গোল, রক্ষণে দেওয়াল— এক রাতে দুই ভূমিকায় সিঙ্গো।
রেফারির শেষ বাঁশিতে ফিলাডেলফিয়া ফেটে পড়লো।
সংখ্যায় ম্যাচ
বল দখলে সামান্য এগিয়ে ছিল ইকুয়েডর (৫২%-৪৮%), কিন্তু শটে এগিয়ে আইভরি কোস্ট (১৫-১২)। ইকুয়েডর দুইবার ক্রসবারে আঘাত করলো, কিন্তু নেট কাঁপাতে পারলো না একবারও।
ইতিহাসের পাতায় দুটি নাম
এই জয়ে ভাঙলো ইকুয়েডরের ১৯ ম্যাচের অপরাজিত ধারা। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার পেছনে দ্বিতীয় হওয়া দলটিকে থামিয়ে দিলো আফ্রিকার হাতিরা।
আর আইভরি কোস্ট, ২০১৪ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপে ফিরে প্রথম ম্যাচেই জয়। জার্মানির পাশাপাশি তিন পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘ই’-র শীর্ষে উঠলো তারা।