শুক্রবার ১২ই জুন, ২০২৬

ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জিতে বাংলাদেশের ইতিহাস

১৫ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন পর পাওয়া সেই সুযোগে সাম্প্রতিক উন্নতির সবটাই মেলে ধরেছে তারা। এতদিন কার্ডিফে পাওয়া জয়ই ছিল অজিদের বিপক্ষে লাল-সবুজদের একমাত্র সাফল্য। এবার তো ঘরের মাঠে গড়েছে ইতিহাস। এই প্রথম ওয়ানডেতে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশ সিরিজের প্রথম ওয়ানডে জিতছে ৮৬ রানে।

বাংলাদেশ সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে জিতেছিল সেই ২০০৫ সালের জুন মাসে। এই জয় এলো ২১ বছর পর।

২৮৫ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে নাহিদ রানার গতি ঝড়ে ৯ উইকেটে ১৯১ রানে থেমেছে অস্ট্রেলিয়া। ৪২.২ ওভারে বজ্রপাত আর বৃষ্টির পর খেলা গড়ানো সম্ভব হয়নি। অবশ্য নবম উইকেট পতনের পর ক্যামেরন গ্রিন ফিফটি তুলে ব্যবধান কমিয়েছেন। নাহলে জয়ের ব্যবধান আরও বাড়তে পারতো বাংলাদেশের। তিনি শেষ পর্যন্ত ৫২ রানে অপরাজিত থাকেন।

ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম কারিগর নাহিদ রানা। শুরুর দুই ওভারে আঘাত হানেন তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান। দুই উইকেট হারানোর পর কুপার কনোলিকে নিয়ে ইনিংস সামলানোর চেষ্টা করেছিলেন জশ ইংলিস। ইংলিসকে ফিরিয়ে এই প্রতিরোধ ভাঙেন নাহিদ রানা। তার পর থেকে পুরো ম্যাচেই ছিল নাহিদের আধিপত্য। মোসাদ্দেক কলোনির উইকেট নেওয়ার পর আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু রানার গতির কাছে পুরোপুরি পরাস্ত হন ৪৭ রান করা ক্যারি। তার বিদায়ে ভাঙে অজিদের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। তার পর তো দ্রুত সময়ে রানা আরও দুই উইকেট তুলে নিলে ১৪০ রানেই আট উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। ১৫৬ রানে নবম উইকেট পতনের পর শেষ দিকে ব্যবধান কমাতে থাকেন ক্যামেরন গ্রিন (৫২*) ও অ্যাডাম জাম্পা (৬*)।

রানা ৪১ রানে ৪ উইকেট নিয়েছেন। ২৪ রানে দুটি নিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। ৩৭ রানে দুটি নেন মোসাদ্দেক হোসেনও। অলরাউন্ড নৈপুণ্য করায় ম্যাচসেরাও তিনি। একটি নেন তাসকিন আহমেদ।

এর আগে চার বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরে দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেছেন মোসাদ্দেক হোসেন। তার অপরাজিত ৮৬ রানের ইনিংসে ভর করে বাংলাদেশ ৮ উইকেটে পায় ২৮৪ রানের সংগ্রহ।

ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ইনিংসটি খেলতে গিয়ে অবশ্য কিছুটা ভাগ্যের সহায়তাও পেয়েছেন মোসাদ্দেক। অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডাররা চারটি ক্যাচ ছেড়েছেন, যার মধ্যে তিনবারই জীবন পেয়েছেন তিনি।

৭০ বলে ৮৬ রানের ইনিংসে মোসাদ্দেক মেরেছেন ৭টি চার ও ৩টি ছক্কা। পঞ্চম উইকেটে তাওহীদ হৃদয়ের সঙ্গে ৭৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন তিনি। পরে অষ্টম উইকেটে তাসকিন আহমেদের সঙ্গে যোগ করেন আরও ৪৫ রান। আর শুরুর দিকে ভিত গড়তে অবদান ছিল তানজিদ হাসান (৫৪) ও নাজমুল হোসেন শান্তর (৬৭)।

৯ উইকেট নেই অস্ট্রেলিয়ার

নাহিদ রানার গতি ঝড়ে পুরোপুরি খেই হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশ এখন জয়ের সুবাস নিচ্ছে। জশ ইংলিসের আউটে তৃতীয় উইকেট পতনের পর কনোলিকে (৩৫) ফেরান মোসাদ্দেক হোসেন। তার পর জুটি গড়ে আশা জাগাচ্ছিলেন অ্যালেক্স ক্যারি- ক্যামেরন গ্রিন। ৩৭ রানের এই জুটি ভেঙে ইনিংসে ধস নামান রানা। ক্যারিকে ৪৭ রানে দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে গ্লাভসবন্দি করান তিনি। তার পর দ্রুত সময়ে মোসাদ্দেকের বলে এলবিডাব্লিউ হন ম্যাট রেনশ। এর পর তো রানার গতিতে দ্রুত বিদায় নেন লিয়াম স্কট (২) ও জেভিয়ার বার্টলেটও (১)। রানার চতুর্থ শিকারে অস্ট্রেলিয়া ১৪০ রানে আট উইকেট হারিয়েছে। তার পর ১৫৬ পড়েছে নবম উইকেট। তার পর অবশ্য ব্যবধান কামাতে থাকেন ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যাডাম জাম্পা। ৪২.২ ওভারে ৯ উইকেটে ১৯১ রান থাকা অবস্থাতে বজ্রপাতে আপাতত বন্ধ রয়েছে খেলা।

বল হাতে দারুণ শুরু বাংলাদেশের

২৮৫ রানের লক্ষ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে শুরুতেই চাপে ফেলেছে বাংলাদেশ। পাওয়ার প্লেতে প্রথম দুই ওভারেই তুলে নেয় দুই উইকেট। প্রথম বলেই তাসকিন আহমেদের বলে বোল্ড হন ওপেনার ম্যাথু শর্ট (০)। তাসকিনের ডেলিভারি সামলানোর কোনও উপায় জানা ছিল না তার। পরের ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের আঘাতে এলবিডাব্লিউ হন মার্নাস লাবুশেন (১)। শুরুতে আম্পায়ার সাড়া দেননি। বাংলাদেশ রিভিউ নেওয়াতে মেলে সাফল্য।

শুরুর ধাক্কার পর ইনিংস সামলানোর চেষ্টা করছিলেন জশ ইংলিস ও কুপার কনোলি। ৪৯ রান যোগ করেন তারা। ১১তম ওভারে এসে ইংলিসকে (১৯) লিটন দাসের গ্লাভসবন্দি করান নাহিদ রানা। তাতে ৫১ রানে তৃতীয় উইকেট হারিয়ে আরও চাপে পড়ে অজি দল।

১৪ ওভার শেষে তাদের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ৭৪ রান। ক্রিজে আছেন অ্যালেক্স ক্যারি (১৮) ও কুপার কনোলি (২৭)।

তানজিদ হাসান (৫৪) ও নাজমুল হোসেন শান্ত (৬৭) শুরুর ভিত গড়ার পর ছন্দপতন ঘটেছিল ইনিংসে। শান্তর বিদায়ে ১৪০ রানে পতন হয় চতুর্থ উইকেটের। তার পর পঞ্চম উইকেটে জুটি গড়ে দলকে ভালো জায়গায় নিয়ে যান মূলত তাওহীদ হৃদয় ও মোসাদ্দেক হোসেন। দলের স্কোর দুইশ ছাড়ান তারা। এই জুটিতে যোগ হয় ৭৫ রান। হৃদয় ৩১ রানে আউট হলেও দলকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে ভালো স্কোর পাইয়ে দিতে ভূমিকা রাখেন ৪ বছর পর ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন। তার ৭০ বলে ক্যারিয়ারসেরা ৮৬ রানের অপরাজিত ইনিংসে ভর করে প্রথম ওয়ানডেতে ৮ উইকেটে ২৮৪ রানের সংগ্রহ পেয়েছে বাংলাদেশ। মোসাদ্দেকের আগ্রাসী ইনিংসে ছিল ৭টি চার ও ৩টি ছক্কা। শেষ দিকে তাসকিন আহমেদও ১৬ বলে ২০ রানের কার্যকরী ইনিংসে ভূমিকা রাখেন। তাতে চিল ২টি চার ও ১টি ছক্কার মার। শেষ দিকে মোসাদ্দেক-তাসকিনের অষ্টম উইকেট জুটিতে যোগ হয়েছে ৩৩ বলে ৪৫ রান।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৩৮ রানে ৩টি উইকেট নেন নাথান এলিস। দুটি করে নেন লিয়াম স্কট ও ম্যাট রেনশ। একটি নিয়েছেন জেভিয়ার বার্টলেট।

খণ্ডকালীন অফস্পিনার ম্যাট রেনশর জোড়া আঘাতে কিছুটা ছন্দ হারিয়েছে বাংলাদেশ। ৩০ ওভার শেষে দলের সংগ্রহ ৪ উইকেটে ১৬৭ রান।

লিটন দাস ৯ বলে ৭ রান করে রেনশর বলেই ফিরতি ক্যাচ দিয়েছেন। এরপর সেট ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্তও তার শিকার হন। ৮৬ বলে ৬৭ রান করা শান্তকে ক্যাচে পরিণত করেন কুপার কনোলি।

প্রথম ওয়ানডেতে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে ১০ রানে সাইফ হাসানকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। তার পর জীবন পেয়েছেন নতুন ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্ত। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে ভালো সূচনা এনে দিয়েছে শান্ত-তানজিদ হাসান জুটি। দ্বিতীয় উইকেটে তাদের জুটিতেই বাংলাদেশ একশ ছাড়িয়েছে। সপ্তম ফিফটি তুলে নেন তানজিদ হাসান। অবশ্য ফিফটি করার পরই ৫৪ রানে নাথান এলিসের বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন তিনি। তাতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় উইকেট হারায় ১০৬ রানে। অপরপ্রান্তে নাজমুল হোসেন শান্তও ফিফটির দেখা পেয়েছেন। ২০ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২ উইকেটে ১২০ রান। শান্ত ব্যাট করছেন ৫৬ রানে, লিটন দাস ৪ রানে ক্রিজে রয়েছেন।

২০১১ সালের পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আজ ওয়ানডে সিরিজ খেলতে নেমেছে বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম ম্যাচে অবশ্য টস ভাগ্য সহায় হয়নি মেহেদী হাসান মিরাজের। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে বেলা ১১টার ম্যাচে টস জিতেছে অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশকে শুরুতে তারা ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছে।

৪ বছর পর জাতীয় দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেনকে নিয়েই একাদশ সাজিয়েছে বাংলাদেশ। দলে দুই অফস্পিনিং অলরাউন্ডার সহ তিন স্পিনার রয়েছে। রয়েছে তিন পেসার। অপরদিকে অজিদের হয়ে লিয়াম স্কটের অভিষেক হচ্চে।

বাংলাদেশ দল: মেহেদী হাসান মিরাজ (অধিনায়ক), সাইফ হাসান, তানজিদ হাসান, নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহীদ হৃদয়, লিটন কুমার দাস, মোসাদ্দেক হোসেন, তানভীর ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা।

অস্ট্রেলিয়া একাদশ: অস্ট্রেলিয়া একাদশ: জশ ইংলিস (অধিনায়ক), জেভিয়ার বার্টলেট, অ্যালেক্স ক্যারি, কুপার কনোলি, নাথান এলিস, ক্যামেরন গ্রিন, মার্নাস লাবুশেন, ম্যাথু রেনশ, লিয়াম স্কট, ম্যাট শর্ট ও অ্যাডাম জাম্পা।

Translate