পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসে চলমান গৃহযুদ্ধ এবার এক নজিরবিহীন চূড়ায় পৌঁছেছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একনায়কতন্ত্র ও সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ এনে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন বীরভূমের চারবারের তৃণমূল সংসদ সদস্য ও বর্ষীয়ান অভিনেত্রী শতাব্দী রায়।
ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি-কে দেওয়া একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে শতাব্দী রায় দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত কয়েক বছরে পুরোপুরি বদলে গেছেন। আর এই কারণেই তিনি দলত্যাগী ও বিদ্রোহী এমপিদের শিবিরে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে শতাব্দী রায় বলেন, ‘দিদি বদলে গেছেন। গত কয়েক বছরে তিনি অনেক পালটে গেছেন। ওনার সঙ্গে আমার একটা আবেগঘন সম্পর্ক ছিল এবং আছে, কিন্তু দিনশেষে আমার কাছে কাজটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাধ্য হয়েই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী এমপিদের ক্যাম্পে এখন অন্যতম প্রধান মুখ শতাব্দী রায়। ইতোমধ্যে তাকে প্রায় এক ডজন বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত উপদলের ‘ডেপুটি লিডার’ বা উপনেতা মনোনীত করা হয়েছে। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি সম্প্রতি দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থনের প্রস্তাব দিয়েছে।
বিক্ষুব্ধ ব্লকের চিফ হুইপ মনোনীত হওয়া আরেক তৃণমূল সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন, এই মুহূর্তে তাদের শিবিরে সমর্থনকারী এমপির সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া দলে কোণঠাসা হওয়ার অভিযোগ তুলে শতাব্দী রায় আরও বলেন, ‘আমাদের কণ্ঠস্বর কেউ শুনছিল না বলেই আমি দল ছাড়ছি। আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। কিন্তু আমাদের কথা শোনার মতো কেউ ছিল না। শুধুমাত্র হাতেগোনা কয়েকজন বিশেষ নেতাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৌঁছাতে পারতেন। বাকি জনপ্রতিনিধিদের পদ্ধতিগতভাবে সাইডলাইন করে রাখা হয়েছিল।’
দলের সর্বস্তরে দুর্নীতির অভিযোগ এনে এই তারকা সংসদ সদস্য বলেন, ‘তৃণমূলের ভেতরে এখন প্রচুর দুর্নীতি। একদম নিচু স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ স্তর পর্যন্ত যে ধরণের দুর্নীতি হচ্ছে, তা দেখে আমি গভীরভাবে হতাশ। নিজের ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখতে আমার কোনো রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রয়োজন নেই, কারণ আমার ইমেজ এমনিতেই পরিষ্কার।’
এদিকে শতাব্দী রায় ও কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত মূল শিবিরের পক্ষ থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। তারা এই বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
এক সংবাদ সম্মেলনে তৃণমূল সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এই সংসদ সদস্যরা দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ নেতা ভূপেন্দর যাদবের বাড়িতে গিয়েছেন, যার মানে তারা আসলে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তারা একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করতেন, আর এখন নিজেদের আখের গোছাতে নরেন্দ্র মোদীকে নেতা মেনে নিয়েছেন। মানুষ কিন্তু বোকা নয়, তারা সব দেখছে।’
অন্যদিকে প্রবীণ তৃণমূল নেতা কীর্তি আজাদ বিদ্রোহীদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন, ‘আমাদের ২৯ জন সংসদ সদস্য ‘মা, মাটি, মানুষ’-এর নামে এবং মমতার প্রতীকে জিতেছিলেন। যদি এই বিদ্রোহীদের ন্যূনতম রাজনৈতিক সততা থাকে, তবে অবিলম্বে সংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিজেপির টিকিটে নতুন করে ভোটে জিতে আসুক।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই নজিরবিহীন বিদ্রোহের পেছনে গত ২০২৪ সালের আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর তৈরি হওয়া জনবিক্ষোভ এবং দলীয় অসন্তোষ বড় ভূমিকা পালন করেছে।
এই সপ্তাহের শুরুতেই তৃণমূলের রাজ্যসভার চিফ হুইপ সুখেন্দু শেখর রায় দল থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি অভিযোগ তুলেছিলেন যে আর জি কর কাণ্ডে তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি যখন দলের ভেতরে আওয়াজ তুলেছিলেন, তখন তাকে সদুত্তর দেওয়ার বদলে কলকাতা পুলিশ দিয়ে সমন পাঠানো হয়েছিল।
তৃণমূলের মূল শিবিরের নেতারা এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, আর জি করের দুঃখজনক ঘটনাটিকে বিজেপি রাজনীতি করার হাতিয়ার বানাচ্ছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে ছিলেন।
তবে শতাব্দী রায় ও কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মতো হেভিওয়েট সংসদ সদস্যদের একযোগে দিল্লির দরবারে হাজির হওয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূলের জন্য বড় ধরণের সাংগঠনিক ধাক্কা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।