বৃহস্পতিবার ২১শে মে, ২০২৬

যুদ্ধের ছায়ায় বিশ্বকাপ ১৯৩৮

তৃতীয় বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ইউরোপের আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ জমে উঠেছিল। অ্যাডলফ হিটলার বাহিনী ‘আনশলুস’র মাধ্যমে অস্ট্রিয়া দখল করে নেয়। জার্মানি অস্ট্রিয়ার সেরা খেলোয়াড়দের নিজেদের দলে টানে। অন্যদিকে স্পেন জ্বলছে গৃহযুদ্ধের আগুনে। পেশাদার ফুটবল নিয়ে দক্ষিন আমেরিকায় তখনও অস্থিরতা চলছিল। উরুগুয়ের সিদ্ধান্ত, ইউরোপে খেলতে যাবে না। তাদের পাশে দাঁড়াল আর্জেন্টিনা।

আর্জেন্টিনার ক্ষোভ ছিল। ১৯৩৬ সালে বার্লিনের অপেরা ক্রলে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে তৃতীয় বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব আর্জেন্টিনাকে দেওয়ার কথা উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত ফরাসি কূটচালে তা হয়নি। এতে  বুয়েনস এয়ার্সের ফুটবল ফেডারেশনের অফিসের বাইরে দাঙ্গা বেঁধে যায়। পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এই সময়ে ইতালি দলেও বড় পরিবর্তন আসে। পুরোনোদের মধ্যে ছিলেন ১৯৩৪ সালের দুই ইনসাইড ফরওয়ার্ড মিজ্জা ও ফেরারি। তবে নতুন মুখের ভিড়েই জন্ম নিচ্ছিল এক দুর্ধর্ষ শক্তি। সবার ওপরে ছিলেন লম্বা, সুঠাম, বিস্ফোরক সেন্টার ফরওয়ার্ড সিলভিও পিওলা। শক্তি, গতি ও নৈপুণ্যের দুর্লভ মিশ্রণে তিনি যেন একাই ঝড় তুলতেন মাঠে। ১৯৩৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকেই গোলের বন্যা বইয়ে দেন তিনি। বিখ্যাত উলভস ম্যানেজার মেজর ফ্রাঙ্ক বাকলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—পিওলা খুব দ্রুত ইউরোপের সেরা সেন্টার ফরওয়ার্ড হবে।

ইতালির গোলপোস্টে ছিলেন দুর্ভেদ্য আলদো ওলিভেরি। রক্ষণে ফনি ও রাভা। মিডফিল্ডে লোকাটেলি। উইংয়ে দুরন্ত গতি নিয়ে এলেন আমেদেও বিয়াভাতি ও জিনো কলৌসি।

১৯৩৫ সালের পর ‘আজুরি’ মাত্র একবার হেরেছিল। কোচ ভিট্টোরিও পোজো লিখেছিলেন—১৯৩৮ সালের দল ছিল অসাধারণ সমন্বিত। তাদের বোঝাপড়া ও নমনীয়তা ছিল অনন্য।

অস্ট্রিয়া তখন আর নেই। ইংল্যান্ড অংশ নিল না। ফলে হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়াকে ইতালির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ধরা হচ্ছিল। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল ‘ইতালি আবারও ট্রফি জিতবে।’

তবে সবার নজর কেড়েছিল ব্রাজিল। প্রতিভায় টগবগে এক দল নিয়ে তারা আসে। সামনে ছিলেন কিংবদন্তি লিওনিডাস। যার বাইসাইকেল কিক, গতি ও গোল করার ক্ষমতা ইউরোপকে হতবাক করে দেয়। তার পাশে ছিলেন দুর্ভেদ্য ফুলব্যাক ডোমিঙ্গোস ডা গাইয়া ও ডাক্তার-ফুটবলার ডাঃ নারিজ।

হাঙ্গেরির হয়ে খেলছিলেন বিস্ময়কর জর্জ সারোশি। তার পাশে তরুণ প্রতিভা সেঞ্জেলার। সেঞ্জেলারের বাজারদর তখন চার লাখ লিরারও বেশি। কিন্তু তিনি বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

অন্যদিকে জার্মানি দলে নতুন কোচ হয়ে আসেন শেপ হারবার্গার। তার কাজ ছিল ছিন্নভিন্ন জার্মান-অস্ট্রিয়ান দলকে এক সুতোয় বাঁধা।

প্রথম রাউন্ডে মার্সাইয়ে ইতালির সামনে দাঁড়ায় নরওয়ে। ম্যাচের আগে ফ্যাসিবাদবিরোধী দর্শকদের বিদ্রূপে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম। পোজো খেলোয়াড়দের বলেন, চিৎকার থামা পর্যন্ত স্যালুট ধরে রাখো।

মাঠে নরওয়ে ছিল ভয়ংকর। বিশেষ করে সেন্টার ফরওয়ার্ড ব্রুনিল্ডসেন ইতালির রক্ষণ কাঁপিয়ে দেন। কিন্তু গোলকিপার ওলিভেরির অসাধারণ সেভ ইতালিকে বাঁচায়। নির্ধারিত সময়ে ১-১। অতিরিক্ত সময়ে পিওলার গোলে ২-১ জিতে কোনোমতে বেঁচে যায় ইতালি।

এদিকে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচ হয়ে ওঠে রুদ্ধশ্বাস নাটক। অতিরিক্ত সময়সহ ম্যাচে হয় ১১ গোল। লিওনিডাস করেন চার গোল, পোল্যান্ডের উইলিমোস্কিও করেন চার গোল। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল জেতে।

জার্মানির বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ড চমক দেখায়। রিপ্লেতে সুইসরা ৪-২ গোলে জিতে যায়।

কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালি মুখোমুখি হয় স্বাগতিক ফ্রান্সের। ৮৫ হাজার দর্শকে ঠাসা কলম্বাস স্টেডিয়ামে শুরু হয় মহারণ। পিওলার দুরন্ত নৈপুণ্যে ইতালি ৩-১ গোলে জিতে যায়। ম্যাচ শেষে পোজো বলেন, ‘আমি যাদুকর নই। শুধু তাদের পথ দেখিয়েছি।’

অন্যদিকে ব্রাজিল চেকোস্লোভাকিয়ার ম্যাচ রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। লাথি, সংঘর্ষ, বহিষ্কার—সব মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি। আহত হন লিওনিডাস, নেজলি, প্লানিকা ও আরও অনেকে। রিপ্লেতে ব্রাজিল জিতে সেমিফাইনালে ওঠে।

সেমিফাইনালের আগে পোজো মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেললেন। তিনি ব্রাজিল শিবিরে গিয়ে বললেন ‘হারলে কিন্তু আবার বোরদেও ফিরতে হবে।’ ব্রাজিলিয়ানরা আত্মবিশ্বাসে বলেছিল, ‘আমরাই জিতব।’

কিন্তু মার্সাইয়ে ইতালির সামনে ভেঙে পড়ে ব্রাজিল। পিওলার চাপে রক্ষণ ভাঙতে থাকে। ডোমিঙ্গোস ডা গাইয়া পেনাল্টি ফাউল করলে মিজ্জা গোল করেন। শেষ পর্যন্ত ইতালি ২-১ জিতে ফাইনালে ওঠে।

অন্য সেমিফাইনালে হাঙ্গেরি ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করে সুইডেনকে। সেঞ্জেলার ও সারোশির আক্রমণে সুইডিশ রক্ষণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

ফাইনালের আগে ইতালির শিবিরে অদ্ভুত চাপ। পোজোর হাতে তখন একটি টেলিগ্রাম, এক খেলোয়াড়ের বাবার মৃত্যুসংবাদ। কিন্তু তিনি ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা কাউকে জানাননি।

ফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ হাঙ্গেরি। ম্যাচ শুরুর ছয় মিনিট পর ইতালির আক্রমণ জ্বলে ওঠে। বিয়াভাতি বল বাড়ালেন মিজ্জাকে, সেখান থেকে কলৌসি গোল করে ইতালিকে এগিয়ে দেন। এক মিনিট পরই টিটকস সমতা ফেরান।

কিন্তু এরপর ইতালির দাপট। মিজ্জা, ফেরারি, পিওলা ও কলৌসির অসাধারণ সমন্বয়ে হাঙ্গেরির রক্ষণ ভেঙে পড়ে। পিওলা করেন দুর্দান্ত গোল। কলৌসি নিজের দ্বিতীয় গোলও পান। হাঙ্গেরি লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত ইতালি ৪-২ গোলে জিতে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে নেয়।

শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগে ভেঙে পড়েন মিজ্জা। কেউ কাঁদছেন, কেউ আলিঙ্গনে ডুবে যাচ্ছেন। পোজো এতটাই আবেগে হারিয়ে গিয়েছিলেন যে খেয়ালই করেননি, ট্রেনারের বালতির পানি তার জুতোর ভেতর ঢেলে দেওয়া হয়েছে।

তারপর পৃথিবী ডুবে যায় যুদ্ধের অন্ধকারে। বিশ্বকাপ থেমে যায় দীর্ঘ এক যুগ। আবার ফুটবলের মহোৎসব ফিরতে অপেক্ষা করতে হয় ১৯৫০ সাল পর্যন্ত।

Translate