একদিকে তীব্র গরমে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি সংকটে কমছে উৎপাদন। ফলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে লোডশেডিং। ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অফিসে কর্মঘণ্টা কমানো, মার্কেট-শপিং মল বন্ধ রাখার সময়সূচি বাড়ানোসহ নানা উদ্যোগ নিলেও সংকট রয়েই গেছে। এমন পরিস্থিতিতে চলমান বিদ্যুৎ সংকটের সহজ সমাধান হিসেবে সৌরবিদ্যুতে জোর দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, চট্টগ্রামের আবহাওয়া ও সূর্যালোকের প্রাপ্যতা বিবেচনায় নগরীর বাসাবাড়ির ছাদগুলোকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে নগরীর বহুতল ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, কমবে বিদ্যুৎ বিলও। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার পথও সুগম হবে।
সোলারে কী সুবিধা মিলবে? পিডিবির তথ্যানুযায়ী- চট্টগ্রাম অঞ্চলে এখন ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪ হাজার ৮৪৯ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। এরমধ্যে কাপ্তাই ও টেকনাফে ২৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, কক্সবাজারে ৬০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ এবং কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। যা মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৭ শতাংশ। বাকি ৯৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস, তেল ও কয়লা দিয়ে। জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট থাকায় এসব কেন্দ্রে এখন উৎপাদন কমে গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী- চট্টগ্রামে গড়ে বছরে প্রায় ২৮০-৩০০ দিন সূর্যালোক পাওয়া যায়। ফলে এখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও তুলনামূলক বেশি। এটি কাজে লাগিয়ে বহুতল ভবন, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করা গেলে নগরীর একেকটি ছাদ একেকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হবে। নিজেদের বিদ্যুৎ দিয়েই নিজেদের চাহিদা মেটানো যাবে।
কী পরিমাণ জায়গা লাগবে, খরচ কত? ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- একক বাসা-বাড়ির জন্য ৩ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার সোলার প্যানেল যথেষ্ট। এতে জায়গা লাগবে প্রায় ৫০০ স্কয়ার ফুট। খরচ হতে পারে দেড় লাখ টাকা। একটি প্যানেলের স্থায়িত্ব ২৫-৩০ বছর হয়। পিডিবির গড় বিদ্যুৎ বিল যদি দেড় হাজার টাকা হয়, তবে মাত্র ৮-৯ বছরেই সোলার স্থাপনের খরচ উঠে আসবে। বাকি সময় ফ্রি ব্যবহার করা যাবে।
নগরীর শপিং মল, মার্কেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, আদালতের জন্য সাধারণত ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার সোলার প্যানেল যথেষ্ট। এটি বসাতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ স্কয়ার ফুট জায়গা প্রয়োজন হতে পারে। খরচ হতে পারে প্রায় ১০ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ মার্কেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিং মলের ছাদে এই পরিমাণ জায়গা রয়েছে।
একইভাবে বড় কারখানার জন্য ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার সোলার প্যানেল বসাতে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৮০ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা। খরচ হতে পারে সাড়ে ৪ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজসহ বড় বড় ডিপো, শিল্প প্রতিষ্ঠানে এই পরিমাণ জায়গা রয়েছে।
সাধারণত ক্যাপেক্স ও ওপেক্স বিজনেস মডেলে সোলার প্যানেল স্থাপন করেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে ক্যাপেক্স মডেলে গ্রাহক পূর্ণ খরচ বহন করেন। সোলার নিজে রক্ষণাবেক্ষণ করেন। অর্থাৎ খরচ ও জায়গা দুটোই গ্রাহক দেন। উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ফ্রিতে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে ওপেক্স মডেলে গ্রাহক শুধু জায়গা দেন। বিনিয়োগ করেন না। বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীকে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য ১৫-২০ শতাংশ কম মূল্যে মাসিক বিল দেন।
কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে চট্টগ্রামে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা দ্রæত স¤প্রসারণ করা সম্ভব। এজন্য সরকারি পর্যায়ে সহজ শর্তে ঋণ, নতুন ভবন নির্মাণে ‘সোলার রেডি’ ডিজাইন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। নেট মিটারিং প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রæত এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনে পরীক্ষামূলকভাবে বড় পরিসরে সোলার প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া গণসচেতনতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূইয়া বলেন, আমরা আমদানি নির্ভর জীবাশ্ম জ¦ালানির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এটি মোকাবিলায় সরকার সোলার থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তা বাস্তবায়ন হলে সংকট থাকবে না। তবে সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের দেশে সরকারি- বেসরকারি পর্যায়ে প্রচারণা কম। এটি বাড়াতে হবে।
চাই নীতি সহায়তা-আলাদা মন্ত্রণালয়: সোলার মডিউল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম বাকি মাসুদ বলেন, সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে পাশের দেশ ভারতে আলাদা মন্ত্রণালয় আছে। আমাদেরও আলাদা মন্ত্রণালয় হলে এই খাতের ছোট-বড় সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান হবে। সোলার স্থাপন কাজে গতি আসবে। এছাড়া আইপিপিসহ ছোট-বড় সোলার প্রজেক্টের জন্য আমদানি কর প্রত্যাহার, দেশে যন্ত্রাংশ তৈরি, সংযোজনের মতো নীতি সহায়তা প্রয়োজন।
জাতীয় গ্রিডে চাপ কমাবে সৌরবিদ্যুৎ : নগরীর বড় বড় অবকাঠামোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হলে তা জাতীয় গ্রিডের উপর চাপ কমাবে বলে মনে করেন পিডিবি দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, শিল্প গ্রাহকদের জন্য মোট লোডের ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন বাধ্যতামূলক। অন্য গ্রাহকদেরও আমরা উৎসাহিত করি। সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন বাড়লে লোডশেডিং থাকবে না। কেউ বেশি উৎপাদন করলে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে আমাদের বিক্রিও করতে পারবে।