মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতে মঙ্গল ও বুধবার (২৮ ও ২৯ এপ্রিল) সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ডুবেছে চট্টগ্রাম নগরী। নগরের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও অলিগলিতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমেছিল। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পানির কারণে যানবাহন আটকে থাকায় রাস্তায় যানজট সৃষ্টি হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েন পথচারী ও যাত্রীরা। এই চিত্র প্রতি বছরের। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে তিনটি সংস্থার চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে একটি মেগা প্রকল্পসহ তিনটি প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের পথে। এরপরও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মেলেনি নগরবাসীর। ফলে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে কবে মুক্তি পাবে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দারা।
গত সোমবার (২৭ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া মৌসুমের প্রথম মুষলধারার বৃষ্টিতে মঙ্গলবার ও বুধবার চট্টগ্রাম নগরের নিম্নাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। মহানগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে আলাদা তিনটি মেগাপ্রকল্পে ১২ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। দফায় দফায় ব্যয় ও সময় বাড়ানোর পর চলতি বছরের জুন মাসে এসব প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গার প্রধান আবহাওয়া কার্যালয়ের গত তিন দিনের (২৭ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার বৃষ্টিতে নগরের মুরাদপুর সড়কে কোমর সমান পানি জমেছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয়েছে পাঁচলাইশ প্রবর্তক মোড় এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এদিন বৃষ্টিতে অল্প সময়ের মধ্যে কোমর থেকে বুক সমান পানি জমে যায়। এ ছাড়াও নগরের কাতালগঞ্জের বৌদ্ধ মন্দিরের সামনের সড়ক ও আবাসিক এলাকায়ও পানি জমে। জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ ছিল। বিকল্প সড়ক দিয়ে চলাচল করেছে গাড়ি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার দুপুরের পর কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে প্রবর্তক, চকবাজার, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, জিইসি, বহদ্দারহাট, হালিশহর, নিউমার্কেট, তিন পুলের মাথাসহ কমপক্ষে ২০টি এলাকা পানির নিচে চলে যায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমর সমান, আবার কোথাও বুক সমান পানি জমে।
অনেক এলাকায় পানি নামতে লেগেছিল ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। পরদিন বুধবারও প্রবর্তক, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশসহ কয়েকটি এলাকায় একই দুর্ভোগে পড়তে হয় বাসিন্দাদের।
নগরের মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা মোরশেদ তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরে প্রতি বছর দেখে আসছি, সামান্য বৃষ্টিতেও পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় মুরাদপুর ও বহদ্দারহাটে। তবে গত বছর পানি কিছুটা কম হয়েছিল। এবার আগের ধারাবাহিকতায় মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কোমর সমান পানি জমে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতার এমন দুর্ভোগ থেকে কবে স্থায়ী মুক্তি মিলবে তা বলতে পারছি না।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে চার প্রকল্প
চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকার চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তিনটি সংস্থা। এর মধ্যে সিডিএ দুটি, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি করে প্রকল্পের কাজ করছে। প্রকল্পগুলোর কাজ চলছে ছয় থেকে ১২ বছর ধরে। গত মার্চ পর্যন্ত এসব প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। কিন্তু কোনও প্রকল্পই শতভাগ শেষ হয়নি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প সিডিএর ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। কাগজে-কলমে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৯০ শতাংশ।
সিডিএ সূত্র জানায়, নগরীর ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি নিয়ে ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট একনেকে জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্প অনুমোদন হয়। পরের বছর ২৮ এপ্রিল নগরীর ‘চশমা খালের’ আবর্জনা অপসারণের মধ্য দিয়ে এটির কাজ শুরু করে সিডিএ। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। প্রকল্প সমাপ্তের সময় ধরা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সংশোধন শেষে প্রকল্প ব্যয় আরও তিন হাজার ১০ কোটি টাকা বেড়ে হয় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। মেয়াদ ঠিক করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১৬৩ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ, ১১৫টি সেতু ও কালভার্ট, ২৭টি সিল্ট ট্র্যাপ, ছয়টি রেগুলেটর নির্মাণ, ২৩ দশমিক ২০ কিলোমিটার নতুন নালা, ৩৬ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার খালের পাশে সড়ক নির্মাণ ও ৯০ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নালা সম্প্রসারণ। বর্তমানে এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নগরীর ‘হিজরা খাল’ ও ‘জামালখান খালের’ সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে।
বাকি তিন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- সিডিএ’র ‘কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ’ শীর্ষক দুই হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের কাজও শেষ পর্যায়ে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবোর অধীনে চলমান ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা/জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ নামের প্রকল্পটির খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে বিভিন্ন খালের সঙ্গে যুক্ত ২৩টি স্লুইস গেট থাকছে। এ প্রকল্পের কাজও প্রায় অর্ধেক শেষ হয়েছে।
এ ছাড়া বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত ২.৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বাড়ইপাড়া খাল খননে ব্যয় হচ্ছে ১৩৭৪ কোটি টাকা। খালটির কাজ ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চট্টগ্রাম প্রতিমন্ত্রী
নগরের জলাবদ্ধতা সরেজমিন দেখতে চট্টগ্রামে ছুটে আসেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এবং আমার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর), দুই জন আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন সরেজমিনে এসে দেখবার জন্য। আমি এসে দেখলাম- চট্টগ্রাম নগরী পানির ওপর ভাসছে না। চট্টগ্রাম নগরী শুষ্ক মৌসুমে যেরকম থাকে সেরকমই আছে।’
বুধবার সন্ধ্যায় নগরের প্রবর্তক এলাকায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি ঘুরে দেখে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথমত আমি মিডিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, আপনারা যেভাবে নিউজটি করেছেন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলছে, চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে। আমি চট্টগ্রাম এসে ঘুরে দেখলাম, সন্ধ্যার পর থেকে। চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে না। চট্টগ্রাম শহর সুন্দর আছে। যেরকম ছিল সেরকমই আছে। হঠাৎ অতি বৃষ্টির কারণে কিছুটা পানি জমা পড়লেও সঠিক সময়ে তা নিষ্কাশন হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রবর্তক মোড়ে জলাবদ্ধতা খুব বেশি হয়নি। ৬০ কিলোমিটার আয়তনের একটা সিটি করপোরেশন। প্রবর্তক মোড়ে আমরা পানির মধ্যে যতটুকু পায়ে হাঁটলাম, এটা ৬০ ফুটও হবে না। সর্বোচ্চ ৩০ ফুট জায়গা; এক গোছা পানি হবে।’
‘প্রধানমন্ত্রী মহানুভবতা ও জনগণের প্রতি তার দরদ থেকে এই ছোট্ট একটি ঘটনা নিয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এরপরে আমার আর কিছু বলার আছে বলে মনে করি না।’
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জানেন, সিটি করপোরেশনের অনেক খালের মধ্যে ৩৬টি খাল সংস্কার, পুনর্নির্মাণ, পানি প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানপাওয়ারের ঘাটতি থাকার কারণে তারা ২০১৬ সালে প্রকল্পটি সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়ন শুরু করে। ২০১৯ সালে সমাপ্ত না হওয়ায় টাইম বর্ধিত হয়ে ২০২২ সাল হয়। ২২ সালে সমাপ্ত না হওয়ায় এটি ২০২৪ করা হয়। ২৪ সালেও সমাপ্ত না হওয়ায় ২০২৬ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। সময়ে সময়ে টাকার পরিমাণও বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমি ওই দিকে আর যাচ্ছি না। আমার কাছে যেটুকু রিপোর্ট রয়েছে ৩০টি খালের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ছয়টি খালের কাজ এমন পর্যায়ে আছে সেটি খুব একটা পানিকে বিঘ্ন ঘটাবে না। আমরা যে খালের কাছে দাঁড়িয়ে আছি এটি ৩৬টি খালের মধ্যে যে ছয়টি খাল বাকি আছে তার মধ্যে একটি হিজড়া খাল।’
১৯ সদস্যের কমিটি
চট্টগ্রাম মহানগরের খাল ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সারা বছর সচল রাখতে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জারি করা এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
অফিস আদেশে বলা হয়, কমিটি চট্টগ্রাম মহানগরের সব খাল ও পানি নিষ্কাশন নালা সারা বছর সচল রাখা, উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের মধ্যে সমন্বয় এবং জলাবদ্ধতাসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কাজ তদারকি করবে।
এ ছাড়া প্রয়োজন হলে মহানগরের উন্নয়নমূলক প্রকল্প দ্রুত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য কমিটি নিয়মিত সভা করবে। জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় বিষয়ে সরকারকে সুপারিশও করতে পারবে এই কমিটি।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আগ্রাবাদ, শেখ মুজিব রোড, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, প্রবর্তক, মেডিক্যাল এলাকা, বাকলিয়া এক্সেস রোড, দক্ষিণ বাকলিয়া, রাহাত্তারপুল ও পশ্চিম বাকলিয়া এলাকা পরিদর্শন করেছি। যেসব এলাকায় কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে তেমন জলাবদ্ধতা হয়নি।’
মেয়র বলেন, ‘হিজরা খাল, জামালখান খাল এবং মুরাদপুর বক্স কালভার্ট—এই তিনটি প্রকল্পে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ ও খাল সংস্কারের কাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী বাঁধ দিতে হয়েছে। এ কারণে পানি প্রবাহ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।’
ডা. শাহাদাত আরও বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছি। গত দুই মাসে একাধিক সমন্বয় সভা হয়েছে এবং সর্বশেষ সভায় আগামী ১৫ মে-এর মধ্যে হিজরা খাল, জামালখান খাল ও মুরাদপুর বক্স কালভার্টের কাজ শেষ করার কথা জানানো হয়েছে। প্রকল্পটি আগামী ১৫ মে-এর মধ্যে শেষ হলে বর্ষা মৌসুমে নগরীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনের বড় প্রকল্প চললেও নগরের সব খাল সেই উদ্যোগের আওতায় আসেনি। নগরে ছোট-বড় ৭১টি খাল আছে। এর মধ্যে ৬১টি খাল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু বড় প্রকল্পে নেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৬টি খাল। অর্থাৎ বাকি ৩৫টি খাল এখনও প্রকল্পের বাইরে। এসব খাল অবহেলিত থাকলে প্রকল্পের পুরো সুফল নগরবাসী পাবে না।’
সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প শুরুর আগে নগরের ১১৩টি এলাকায় সর্বোচ্চ ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পানি জমে থাকতো। পরে জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা ও পানি জমে থাকার সময় কিছুটা কমে আসে। গত বছর ২৯টি স্থানে পানি জমেছিল, বেশির ভাগ জায়গায় দুই থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়। চলতি বছর জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা ১০টিতে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু হিজড়া ও জামালখান খালে বাঁধ থাকার কারণে মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই কমপক্ষে ২০টি এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বাঁধ সরানো গেলে পানি নামার পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে বলে সিডিএর কর্মকর্তারা আশা করছেন।
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের পরিচালক ও ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরী বলেন, ‘খালের দুই পাশে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পানি শুকিয়ে (ডিওয়াটারিং) কাজ পরিচালনা করা হচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাতে প্রবর্তক মোড়সহ কয়েকটি এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘জলাবদ্ধতা দ্রুত মোকাবিলায় ১৬টি কুইক রিঅ্যাকশন টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নালা ও খাল পরিষ্কার করবে। বর্তমানে ২৯টি এক্সকাভেটর ও পর্যাপ্ত জনবল নিয়ে খালগুলোর মাটি অপসারণের কাজ চলছে। বুধবার সকাল ৮টার মধ্যেই সব অস্থায়ী বাঁধ অপসারণ করে পানির পথ উন্মুক্ত করা হয়।’
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নগরীর মোট ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি খাল মেগা প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। এসব খালের কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো জলাবদ্ধতামুক্ত হবে।’
এ প্রসঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন বলেন, ‘হিজরা খালে ২০টির মতো এবং জামালখান খালে ১০টি বাঁধ আছে। আসলে ১৫ মে-এর মধ্যে কাজ শেষ করে বাঁধ খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ায় সমস্যাটা হয়ে গেছে। আমরা সবগুলো বাঁধ কেটে দিয়েছি। এরপর পানি নেমে গেছে। আপাতত আর বাঁধ দেওয়া হবে না। শুধু পরিষ্কার করা হবে।’
সিডিএর চেয়ারম্যান নুরুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রকল্পের কিছু সুফল ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। গত বছর আগের তুলনায় কম এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘সব খাল একসঙ্গে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রথম ধাপে ৩৬টি খাল নেওয়া হয়েছে। বাকি খালগুলো পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

