মাহমুদ আহমাদিনেজাদ যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন তার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা রাজনীতিক আবদোরেজা দাভারি বলেন, ‘মোজতবা এমনভাবে দেশ পরিচালনা করছেন যেন তিনি বোর্ডের পরিচালক।’ তিনি আরও বলেন, ‘তিনি বোর্ডের সদস্যদের পরামর্শ ও নির্দেশনার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং তারা সম্মিলিতভাবেই সব সিদ্ধান্ত নেন। আর এই বোর্ডের সদস্যরাই হলেন জেনারেলরা।’
আহত মোজতবার নিঃসঙ্গতা
খামেনির পারিবারিক কম্পাউন্ডে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা হামলার পর থেকে মোজতবা খামেনি লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছেন। ওই হামলায় তার বাবা, স্ত্রী ও ছেলে নিহত হন। বর্তমানে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা অত্যন্ত কঠিন। তিনি মূলত চিকিৎসকদের একটি দলের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন, যারা হামলায় পাওয়া তার আঘাতের চিকিৎসা করছেন।
দেশটির চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মোজতবা মারাত্মক আহত হলেও মানসিকভাবে তীক্ষ্ণ ও সচেতন। তার এক পায়ে তিনবার অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি কৃত্রিম অঙ্গের অপেক্ষায় আছেন। একটি হাতের অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি ধীরে ধীরে তা ব্যবহার করতে পারছেন। মুখমণ্ডল ও ঠোঁটে গুরুতর দগ্ধ হওয়ায় তার কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তার প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও শারীরিক অবস্থার কারণে কোনও ভিডিও বা অডিও বার্তা রেকর্ড করেননি তিনি। তার কাছে কোনও বার্তা পাঠাতে হলে তা হাতে লিখে খামে ভরে বিশ্বস্ত বাহকদের মাধ্যমে মোটরসাইকেল বা গাড়িতে করে পৌঁছাতে হয়।
জেনারেলদের উত্থান ও ক্ষমতার ত্রিভুজ
রেভল্যুশনারি গার্ড ১৯৪৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের রক্ষক হিসেবে গঠিত হয়েছিল। তারা ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে আসীন হয়েছে, প্রধান প্রধান শিল্পে বিনিয়োগ করেছে এবং গোয়েন্দা কার্যক্রমে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এখন মোজতবার অবস্থানের কারণে তারা আরও শক্তিশালী। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ‘মোজতবা সর্বোচ্চ নেতা হতে পারেন, কিন্তু তিনি তার বাবার মতো ‘সর্বোচ্চ’ নন। তিনি বিপ্লবী গার্ডের কাছে নতজানু, কারণ তিনি তার অবস্থান ও ব্যবস্থার টিকে থাকার জন্য তাদের কাছে ঋণী।”
মোজতবার সঙ্গে গার্ডের জেনারেলদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। কিশোর বয়সে ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি হাবিব ব্যাটালিয়নে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে তৈরি হওয়া বন্ধুত্বই এখনকার ক্ষমতার মূল ভিত্তি। মোজতবা, সাবেক গোয়েন্দা প্রধান হোসেইন তায়েব এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ—এই তিনজনকে নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘ক্ষমতার ত্রিভুজ’।
প্রান্তিক পর্যায়ে বেসামরিক সরকার
বর্তমান সম্মিলিত নেতৃত্বে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। জেনারেলরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ টিকে থাকার লড়াই, তাই কৌশলের ক্ষেত্রে তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এমনকি যিনি যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচিও এখন এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছেন। পরিবর্তে পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
আলোচনা ভেঙে যাওয়ার নেপথ্যে
গত মঙ্গলবার যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য ইসলামাবাদ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন জেনারেলরাই সেই উদ্যোগ ভেস্তে দেন। আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের কারণে জেনারেলরা মনে করছেন আলোচনা অর্থহীন। কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল ভাহিদি ও অন্যান্য জেনারেলরা মনে করেন, ট্রাম্প সমঝোতা চান না, বরং আত্মসমর্পণ করাতে চান। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা ভেবে আলোচনার পক্ষে থাকলেও জেনারেলদের জেদের কাছে হার মানতে হয়েছে।
কট্টরপন্থিদের চাপ
ইরানে সাঈদ জালিলির নেতৃত্বাধীন একটি অতি-কট্টরপন্থি গোষ্ঠী রয়েছে, যারা কোনও ধরনের ছাড় দেওয়ার বিরোধী। তাদের সমর্থকরা নিয়মিত রাস্তায় নেমে স্লোগান দিচ্ছেন, ‘কমান্ডার, আমাদের আদেশ দিন, আমরা অনুসরণ করব।’ অন্যদিকে স্পিকার গালিবাফ জাতীয় টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আশ্বাস দিয়েছেন যে, মোজতবা খামেনি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত আছেন। তিনি বলেন, ‘সামরিক অর্জন মানেই এই নয় যে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এখন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সেই অর্জনগুলোকে কাজে লাগানোর সময় এসেছে।’