বার্লিন উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণভালুক (গোল্ডেন বেয়ার) জিতেছে তুর্কি ভাষার চলচ্চিত্র ‘ইয়েলো লেটারস’। তুরস্কের রাজধানী আনকারায় রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হওয়া এক মঞ্চশিল্পী দম্পতির বৈবাহিক জীবনে কী ঘটে, সেই গল্প তুলে ধরা হয়েছে এতে।
‘ইয়েলো লেটারস’ পরিচালনা করেছেন তুর্কি-জার্মান পরিচালক ইলকার চাতাক। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে ৭৬তম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ভালুক আকৃতির সোনালি ‘গোল্ডেন বেয়ার’ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় তার হাতে। জার্মানির বার্লিনে উৎসবটির মূলকেন্দ্র বার্লিনালে প্যালাস্টে জমকালো মঞ্চে তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা নিজেদের জন্য হুমকি নই। আমাদের জন্য প্রকৃত হুমকি হচ্ছে স্বৈরশাসকরা। তারা ক্ষমতায় বসে আমাদের জীবনযাত্রার ধরন ধসিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালায়। আসুন, আমরা নিজেদের মধ্যে লড়াই না করে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।’
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব সাধারণত রাজনৈতিক বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এবারের আসরে গাজা যুদ্ধ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। মূল প্রতিযোগিতায় বিচারকদের মন জয় করে নিলো রাজনৈতিক মোড়কে নির্মিত ছবি ‘ইয়েলো লেটারস’। উৎসবে জুরি সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন জার্মান পরিচালক ভিম ভেন্ডার্স। তার নেতৃত্বে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন নেপালি পরিচালক মিন বাহাদুর ভাম, ভারতীয় নির্মাতা শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর, জাপানিজ পরিচালক হিকারি, দক্ষিণ কোরিয়ার অভিনেত্রী বে ডুনা, আমেরিকান পরিচালক রেইনাল্ডো মার্কাস গ্রিন ও পোলিশ প্রযোজক এভা পুসচিস্ক।
পুরস্কার হাতে ইলকার চাতাক ও ‘ইয়েলো লেটারস’ টিম
‘ইয়েলো লেটারস’-এর শুটিং হয়েছে জার্মানিতে। ছবিটিতে মঞ্চশিল্পী দম্পতির ভূমিকায় আছেন তুর্কি অভিনেত্রী অজগু নামাল ও অভিনেতা তানসু বিচার। গল্পে ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার তাদের। কিন্তু স্বামী আজিজ অনলাইনে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় নিশানায় পড়লে কাজ ও বাড়ি হাতছাড়া হয়ে যায় দম্পতির। আনকারা ছেড়ে সাময়িকভাবে থাকতে ইস্তানবুলে চলে যেতে বাধ্য হয় তারা। জীবিকার তাগিদে একপর্যায়ে স্ত্রী দেরিয়ার সঙ্গে আজিজের দূরত্ব বাড়তে থাকে।
উৎসবে গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার হিসেবে সিলভার বেয়ার জিতেছে আরেক তুর্কি ছবি ‘স্যালভেশন’। এর নির্মাতা এমিন আলপাশ তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান ও গাজায় নিপীড়িত মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এখানে আমরা অন্তত নীরবতা ভেঙে আওয়াজ তুলে তাদের মনে করিয়ে দিতে পারি, তারা মোটেও একা না।’
‘রোজ’ ছবিতে পুরুষের বেশে অভিনয়ের সুবাদে সেরা অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার জিতেছেন জার্মান অভিনেত্রী সান্দ্রা হুলার। ২০২৪ সালে বিভিন্ন বিভাগে অস্কার জয়ী ‘অ্যানাটমি অব অ্যা ফল’ ও ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’ ছবিতে অভিনয় করে আলোচিত হন তিনি। সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখে বার্লিনে সিলভার বেয়ার পেয়েছেন এই তারকা।
ফরাসি তারকা জুলিয়েট বিনোশ অভিনীত ‘কুইন অ্যাট সি’ পেয়েছে জুরি পুরস্কারসহ দুটি স্বীকৃতি। মায়ের তীব্র ডিমেনশিয়ার সঙ্গে লড়াই এবং এর কারণে নিজের দাম্পত্য জীবনে প্রভাব পড়া একজন নারীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জুলিয়েট বিনোশ। ল্যান্স হ্যামার পরিচালিত ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য যৌথভাবে সেরা পার্শ্ব অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী আনা ক্যাল্ডার-মার্শাল ও অভিনেতা টম কোর্টনে।
আমেরিকান কিংবদন্তি জ্যাজ পিয়ানোবাদক বিল এভান্সের সাদাকালো বায়োপিক ‘এভরিবডি ডিগস বিল এভান্স’ ছবির জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতেছেন গ্র্যান্ট জি। এতে বিল এভান্সের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নরওয়ের অভিনেতা আনেশ দনিয়েলসেন লি।
সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার জিতেছে ‘নিনা রোজা’। ছবিটির গল্প একজন আর্ট কিউরেটরকে কেন্দ্র করে, যিনি এক শিশুর চিত্রপ্রতিভা সত্যিই অসাধারণ কিনা যাচাই করতে বুলগেরিয়ায় ফেরেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় বার্লিন উৎসব। উদ্বোধনী আয়োজনে সম্মানসূচক স্বর্ণভালুক পেয়েছেন অস্কারজয়ী মালয়েশিয়ান অভিনেত্রী মিশেল ইয়ো। এবারের আসরে ৮০টি দেশের পরিচালকদের মোট ২৭৮টি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী হয়েছে। এরমধ্যে গোল্ডেন বেয়ার পুরস্কারের জন্য মূল প্রতিযোগিতায় ছিল মোট ২২টি চলচ্চিত্র। উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক বিভাগের মধ্যে ছিল মূল প্রতিযোগিতা, পার্সপেক্টিভস (সেরা নবীন পরিচালক), জেনারেশনস, প্যানোরামা, ফোরাম, শর্টস ও ডকুমেন্টারি।
জেনারেশন কেপ্লাস বিভাগে স্পেশাল মেনশন পেয়েছে ভারতের রিমা দাস পরিচালিত ‘নট অ্যা হিরো’। একই বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের ক্রিস্টাল বেয়ার পুরস্কার জিতেছে ব্রাজিলের অ্যালান ডেভার্টন পরিচালিত “গুগু’স ওয়ার্ল্ড”।
উৎসবে প্রতিযোগিতার বাইরে রাখা হয় স্পেশাল স্ক্রিনিং ও ক্ল্যাসিক সিনেমা স্ক্রিনিং বিভাগ দুটি। রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) এবারের আসরে পর্দা নামছে।
৭৬তম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের বিজয়ী তালিকা
মূল প্রতিযোগিতা
সেরা চলচ্চিত্র (গোল্ডেন বেয়ার): ইয়েলো লেটারস, পরিচালক: ইলকার চাতাক (তুরস্ক)
গ্র্যান্ড জুরি প্রাইজ (সিলভার বেয়ার): স্যালভেশন (পরিচালক: এমিন আলপাশ, তুরস্ক)
জুরি প্রাইজ (সিলভার বেয়ার): কুইন অ্যাট সি (পরিচালক: ল্যান্স হ্যামার, যুক্তরাষ্ট্র)
সেরা পরিচালক (সিলভার বেয়ার): গ্র্যান্ট জি (সিনেমা: এভরিবডি ডিগস বিল এভান্স, যুক্তরাজ্য)
সেরা প্রধান অভিনয়শিল্পী (সিলভার বেয়ার): সান্ড্রা হুলার (সিনেমা: রোজ, জার্মানি)
সেরা পার্শ্ব অভিনয়শিল্পী (সিলভার বেয়ার): আনা ক্যাল্ডার-মার্শাল ও টম কোর্টনে (সিনেমা: কুইন অ্যাট সি, যুক্তরাজ্য)
সেরা চিত্রনাট্য (সিলভার বেয়ার): নিনা রোজা (জেনেভিয়েভ দুলুদ-দে সেল, কানাডা)
আউটস্ট্যান্ডিং সিনেম্যাটিক কন্ট্রিবিউশন (সিলভার বেয়ার): আনা ফিচ, ব্যাঙ্কার হোয়াইট (সিনেমা: ইয়ো [লাভ ইজ অ্যা রেবেলিয়াস বার্ড], যুক্তরাষ্ট্র)
সম্মানসূচক গোল্ডেন বেয়ার: মিশেল ইয়ো