গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি)। ফলে ভোটাধিকার প্রয়োগের অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে। এবার চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারী ও আংশিক বায়েজিদ আসনটিতে নির্বাচনে তরুণ ও বিভিন্ন বয়সের ভোটাররা অধীর আগ্রহ নিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য মাঠে তিন স্তরে নিরাপত্তা বলয় নিয়ে থাকবে। তারা উৎসবমুখর পরিবেশে সুষ্ঠু, অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে নিরলসভাবে কাজ করছে, জানিয়েছে।
বিগত দেড় দশক ধরে নানা ঘটনায় আলোচিত বন্দর নগরী চট্টগ্রামের লাগোয়া কওমিপন্থিদের সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের দুর্গ বলে খ্যাত ও বিএনপির ভোটব্যাংক হিসাবে বিবেচিত এই আসনটিতে নির্বাচনে লড়ছেন ৬ জন প্রার্থী।
তারা হলেন—বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন মুনির (রিকশা), ইসলামী আন্দোলনের মতি উল্লাহ নূরী (হাতপাখা), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম (চেয়ার), স্বতন্ত্র প্রার্থী ইমাম উদ্দিন রিয়াদ (ফুটবল) এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. আলাউদ্দিন (আনারস)।
আন্তঃপ্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও আসনটিতে লড়াই হবে মূলত দ্বিমুখী। নির্বাচনে প্রচারণাকালে মাঠ চষে বেড়ানোর চমকে এবং ভোটারদের আলোচনায় ও জনসমর্থনে বেশ এগিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের ছেলে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
ওই আসনে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন মুনির ও মতি উল্লাহ নূরীকে নির্বাচনি এলাকায় ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চাইতে দেখা গেলেও বাকি তিনজন প্রার্থীর প্রচারণা তেমন চোখে পড়েনি বলে স্থানীয় ভোটাররা জানিয়েছেন। এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
বিগত ১৯৭৩ সালে এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে এম আবদুল ওহাব, ১৯৭৯ সালে বিএনপি থেকে এবং জাতীয় পার্টি থেকে ১৯৮৬, ১৯৮৮, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দলে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং ১৯৯১, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি), ১৯৯৬ (জুন) ও ২০০১ সালে বিএনপি থেকে সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম এমপি নির্বাচিত হন। জোটগত কারণে কল্যাণ পার্টির অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বীর প্রতীককে ২০১৮ সালে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তিনি নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে পারেননি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী জনগণ বেছে নিতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান (বর্তমানে একাংশের চেয়ারম্যান) ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ তিন মেয়াদে এমপি নির্বাচিত হন। তবে চব্বিশের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ায় এখানে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য সংগঠনের সাংগঠনিক অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।
সরেজমিনে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-৫ আসনের অধিকাংশ ভোটার হাটহাজারী উপজেলার বাসিন্দা। উপজেলার নিত্য জনদুর্ভোগ নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের শেষ নেই। এর মধ্যে যানজট নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব তারা। নির্বাচিত সংসদের কাছে যানজট দূর করার প্রতিশ্রুতি চান ভোটাররা।
বেসরকারি চাকরিজীবী মো. লোকমান হাটহাজারী পৌরসভার আলমপুর থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম শহরে আসা-যাওয়া করেন। তিনি বলেন, শহরের চেয়ে বেশি যানজট হাটহাজারীতে। প্রতিদিন বাসস্ট্যান্ড এলাকা হয়ে হাটহাজারী ঢুকতে আর বের হতে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় হাতে রেখে যেতে হয়। বিগত সময়ে এই আসনের ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেও এখানকার লোকজনের সমস্যার সমাধান হয়নি।
এরই মধ্যে ২০০৮ সালের পর আর ভোট দিতে পারেনি উপজেলার মেখল ইউনিয়নের ষাটোর্ধ ফরিদুল আলম। তার দুই ছেলে দিনমজুর। যে আয় হয় তাতে সংসার চলে না। নতুন সরকার মানুষের দুঃখ দূর করবে এমটাই তিনি আশা করছেন। তাই এবার তিনি ভোট দিতে অধীর আগ্রহী।
এছাড়া এই আসনের আওতাধীন নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ড। কিন্তু ১৮ বছর ধরে এখানকার ৪০ হাজার বাসিন্দা নতুন ভবন নির্মাণ করতে পারছেন না। এই কারণে এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। দক্ষিণ পাহাড়তলীর শাহজালাল রোডের একটি চা-দোকানে ভোটের কথা তুললে সেখানে থাকা মো. জামাল নামের এক প্রবাসী বলেন, সরকার যায়, সরকার আসে। কিন্তু ১৮ বছর ধরে বাড়ি তুলতে পারছি না। ভোট দিয়ে কী হবে। শেষবারের মতো এবার ভোট দেব। দেখি এবার কী হয়?
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ধানের শীর্ষের প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, বিএনপি সব সময় জনগণকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতি পালন করেছে। ধানের শীষে ভোট দিয়ে কেউ প্রতারিত হয়নি। কারণ গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতীক হচ্ছে ধানের শীষ। আজ ১২ ফেব্রুয়ারি সবাইকে ধানের শীষে ভোট দিয়ে দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ও শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য আমি আহ্বান জানাই। হাটহাজারীবাসীর সেবা করতে চাই। আগামীতে হাটহাজারীই হবে দেশে উন্নত-সমৃদ্ধ, শান্তি-সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নগরী।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত হলে হাটহাজারীসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান খাতে বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে আপসহীন ভূমিকা রাখব। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত, মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন, যুবসমাজকে নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলা এবং নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পক্ষান্তরে রিকশা প্রতীকের মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির বলেন, আমি হাটহাজারীর মানুষের পরীক্ষিত বন্ধু। ২০১৪ সালে আপনারা আমাকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছিলেন। আমি নির্বাচিত হলে হাটহাজারী আসনকে একটি মডেল জনপদ হিসেবে গড়ে তুলব, যেখানে কোনো সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজি থাকবে না। তিনি উন্নত যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিসহ ১৩ দফার একটি রূপরেখা তুলে ধরেন।
নির্বাচন অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-৫ আসনটি একটি পৌরসভা, ১৪টি ইউনিয়ন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট সাধারণ ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬২৩ জন পুরুষ ভোটার, ২ লাখ ৪০ হাজার ৫২২ জন নারী ভোটার এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন। এছাড়া পোস্টাল ভোটার রয়েছেন ৬ হাজার ৭৭০ জন। আসনটিতে মোট ভোটকেন্দ্র ১৪৩টি, এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে ৩১টি।
হাটহাজারী ইউএনও ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন বলেন, নির্বাচনে সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ উপলক্ষ্যে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং মোবাইল কোর্ট ও স্ট্রাইকিং ফোর্স বিশেষ করে বিজিবি, কোস্টগার্ড ও সশস্ত্র বাহিনীর টিমকে আইনানুগ দিকনির্দেশনা প্রদানের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) নির্বাচনি এলাকার ৬ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিক মাঠে থাকবে।
নির্বাচনি এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তার চাদরে ঘেরা—এমনটা জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী তারেক আজিজ জানান, নির্বাচন ও গণভোটে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবার কঠোর নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো সিসিটিভির আওতায় আনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকবে, যার মাধ্যমে সব কিছু রেকর্ড করা হবে।