বুধবার ২২শে এপ্রিল, ২০২৬

কাজে আসছে না ৩৪ কোটি টাকার ই-গেট

দেশের দুই বিমানবন্দর (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) ও স্থলবন্দর হয়ে বিদেশে যাতায়াতকারী ই-পাসপোর্টধারী যাত্রীদের সেবায় স্থাপিত ৪৪টি ই-গেট কারও কাজে আসছে না। সাড়ে ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ই-গেট কেন করা হলো তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ই-গেট চালু থাকলেও যাত্রীর বিড়ম্বনা কমে না। বরং বেড়ে যায়। এমনকি, হয়রানি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক যাত্রী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় দেশের বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে ই-পাসপোর্টধারী যাত্রীদের সেবায় ৪৪টি ই-গেট স্থাপন করা হয়। ‘বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন’ প্রকল্পের আওতায় এসব ই-গেট স্থাপন করা হয়।

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল চার হাজার ৬৩৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে রহস্যজনক কারণে ওই ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৯ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের অনুমোদিত মেয়াদ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।

২০১৯ সালে ই-গেট স্থাপনের পর বিমানবন্দর কর্মকর্তারা এটি পরিচালনার প্রশিক্ষণ পান। ই-গেটগুলো বিমানবন্দরে স্থাপনের কাজটি করেছে জার্মান সংস্থা ভেরিডোস জিএমবিএইচ। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে তারা এ প্রকল্পের চুক্তিটি পায়। স্থাপনের পর এসব ই-গেট বেশ কয়েকবার চালু ও বন্ধ করা হয়। এখন এই সেবা বন্ধ রয়েছে।

ইমিগ্রেশনের তথ্য মতে, রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৬টি, চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে ছয়টি, সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরে ছয়টি, বেনাপোল স্থলবন্দরে চারটি এবং বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে দুটি ই-গেট রয়েছে। ই-গেট স্থাপনের আগে বলা হয়েছিল, মাত্র ১৮ সেকেন্ডেই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা হবে।

সম্প্রতি সরেজমিন ইমিগ্রেশন ঘুরে দেখা যায়, ই-গেট সেবা বন্ধ রয়েছে। ইমিগ্রেশন ডেস্কে আগের মতোই যাত্রীদের ভিসা ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করার প্রয়োজন হচ্ছে। এতে আগের তুলনায় এখন আরও বেশি সময় লাগে।

ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ও যাত্রীরা যা বলছেন

যাত্রীরা জানান, ম্যানুয়ালি লাইনে দাঁড়িয়ে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে হচ্ছে। এতে দ্বিগুণ সময় ও বিড়ম্বনা তৈরি হয়। সম্প্রতি বিমানবন্দরে কথা হয় সিঙ্গাপুরে যাওয়া যাত্রী লিটন কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, “ই-পাসপোর্ট এক সময় বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল। ই-পাসপোর্ট করার করার আগে এই ই-গেট বসানো হয়েছে। দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি যে পাবলিকের টাকায় কেনা এসব ই-গেট ব্যবহার হচ্ছে না।

থাইল্যান্ডে ঘুরতে যাওয়া রাজিব আহম্মেদ বলেন, “এটা আমাদের প্রথম ফ্যামিলি ট্যুর। আগে শুনেছি ই-পাসপোর্ট দিয়ে ১৮ সেকেন্ডে ইমিগেশন পর হওয়া যায়। তিন ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে এসেছি। ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছে। প্রথম ভিসা চেক করিয়েছি। এখন ইম্রিগেশন চলছে।”

এ বিষয়ে ইমিগ্রেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, “যারা ই-গেট ব্যবহার করছেন, তাদের ভিসা যাচাইসহ অন্যান্য কাজের জন্য ফের ইমিগ্রেশন ডেস্কে যেতে হয়। ফলে আগের মতোই বেশি সময় লাগে। এতে যাত্রী রাগান্বিত হয়ে যান। এছাড়া অনেক সময় ই-গেট সফটওয়্যারে ডেটা ইমিগ্রেশন সফটওয়্যারে আসে না। এ জন্য ই-গেট বন্ধ রাখা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে যাওয়ার সময় ই-গেট বন্ধ। তবে যারা দেশে আসে তারা ই-গেট খোলা পাচ্ছেন।” ই-গেট বন্ধ কেন জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, “এ বিষয়ে কোনও তথ্য আমার কাছে নেই।”

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞরা যা জানালেন

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ই-পাসপোর্ট চালু করে বাংলাদেশ। এর সুফল নিতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালু করা হয় ই-গেট। স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করায় দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল ইমিগ্রেশন কার্যক্রম। তবে, কারিগরি ত্রুটি, যাত্রীর ভিসা যাচাইসহ অন্য কাজ ম্যানুয়ালি করায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, ই-গেট খোলা থাকলেও সেই আগের নিয়মেই যেতে হতো ইমিগ্রেশন ডেস্কে। এতে জটিলতা বাড়ায় ই-গেটের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইমিগ্রেশন পুলিশের (এসবি) একাধিক সদস্য জানান, দিনে যত সংখ্যক যাত্রী বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন তাদের প্রায় ৪০ শতাংশের ই-পাসপোর্ট রয়েছে। এ পাসপোর্ট দিয়ে ই-গেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুধু পাসপোর্ট ও যাত্রীকে শনাক্ত করা যায়। কিন্তু, স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাত্রীর ভিসা পরীক্ষা করা যায় না। এছাড়া যাত্রী কোথায় যাবে, কোন উড়োজাহাজে ভ্রমণ করবে, ই-গেটে সেই তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলে ই-গেট ব্যবহার করলেও আগের মতোই ভিসা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে ম্যানুয়ালি। এতে ইমিগ্রেশনে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। এর মধ্যে কাছাকাছি সময়ে একাধিক ফ্লাইট অবতরণ করলে বা গেলে ইমিগ্রেশনে আরও বেশি চাপ পড়ে। এই চাপ সামলাতে ইমিগ্রেশন পুলিশকেও হিমশিম খেতে হয়।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ বলেন, “ই-গেট দিয়ে শুধু পাসপোর্টের তথ্য যাচাই করা যায়। ভিসা ও অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ নেই। এ জন্য ই-গেট বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ই-গেট বন্ধ রাখতে বলেছেন। আমার গেট চালু করার জন্য বেশ কয়েকবার তাগিদও দিয়েছি। আশা করছি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হবে।”

এ বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, যা পাবলিকের টাকায় করা। যাত্রী যদি সেবা না পায় তবে এই গেট করা অর্থহীন। আগে চিন্তা করা উচিত ছিল। যেহেতু এখানে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, সরকারও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এই দায় এড়াতে পারে না।”

তিনি আরও বলেন, “সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই ডিজিটাল সেবাটি চালু রয়েছে। সেখানে জনবল নেই বললেই চলে। তাহলে আমাদের প্রতিবন্ধকতা কোথায়, তা খুঁজতে হবে। ই-গেট চালু থাকলে যাত্রী সেবার মান বাড়বে ও সময় বাঁচবে।”

কাজী ওয়াহিদুল আলম আরও বলেন, “ই-গেট দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তা পরবর্তীতে আর কাজে আসবে না। এছাড়া চালু করতে সরকারের পয়সা গুনতে হবে। তাই সরকার উচিত এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।”

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফয়সল আহমেদের যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তিনি তথ্যের জন্য ফর্ম জমা দেওয়া পরামর্শ দেন। এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, “কথা বলা নিষেধ আছে।”

বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন পুলিশ (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “বহির্গমন এলাকায় দুটি এবং অ্যারাইভালে (আগমনী) দুটি ই-গেট চালু রয়েছে। সেখানে চার জন কর্মকর্তা কাজ করছেন।”

Translate