বৃহস্পতিবার ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬

লন্ডনে উপনিবেশের লুণ্ঠিত অলঙ্কারের প্রদর্শনী, অ্যাক্টিভিস্টদের বিক্ষোভ

টাওয়ার অব লন্ডনে সংরক্ষিত ব্রিটিশ রাজকীয় অলঙ্কার বা ‘ক্রাউন জুয়েলস’-এর কাঁচের আবরণে কাস্টার্ড ও ফ্রুট ক্রাম্বল ছুড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে ব্রিটিশ অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ টেক ব্যাক পাওয়ার (টিবিপি)। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ ভাঙচুর মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক বিশাল ঐতিহাসিক পরিহাস। যে অলঙ্কারগুলোকে ব্রিটিশরা তাদের আভিজাত্যের প্রতীক মনে করে, ঐতিহাসিকভাবে সেগুলোর সিংহভাগই আসলে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে সুকৌশলে লুণ্ঠিত সম্পদ।

রাজকীয় অলঙ্কার: লুণ্ঠিত সম্পদের ভাণ্ডার

টাওয়ার অব লন্ডনের এই প্রদর্শনীকে অনেক ইতিহাসবিদই ‘বিশ্বের বৃহত্তম চোরাই মালের সংগ্রহশালা’ হিসেবে অভিহিত করেন। এর সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো জগদ্বিখ্যাত ‘কোহিনূর’ হীরা। ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব দখলের পর মাত্র ১০ বছর বয়সী শিখ মহারাজা দলীপ সিংকে চাপের মুখে ফেলে ‘লাহোর চুক্তিতে’ স্বাক্ষর করাতে বাধ্য করে ব্রিটিশরা। সেই চুক্তির আড়ালে মূলত হীরাটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে ব্রিটেন কেবল ভারত থেকেই প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে। আজকের এই বিক্ষোভ সেই ঐতিহাসিক অবিচারের বিরুদ্ধেই এক তীব্র চপেটাঘাত।

অতীত ও বর্তমানের চৌর্যবৃত্তি

বর্তমানের এই অস্থির সময়ে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, ইতিহাস কি আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে? একসময় রাষ্ট্রীয় মদদে পুরো একটি মহাদেশকে নিঃস্ব করা হয়েছিল, আর আজ আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে সেই লুণ্ঠিত সম্পদকে ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে আগলে রাখা হচ্ছে। টেক ব্যাক পাওয়ার যখন লন্ডনের অভিজাত সুপারশপগুলো থেকে পণ্য সরিয়ে অভাবীদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, তখন তারা মূলত প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার চরম বৈষম্যকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। যখন ব্রিটিশ রাজতন্ত্র শত শত বছর ধরে ভারতের সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে, তখন আইন কেন নীরব থাকে, সেই মৌলিক প্রশ্নটিই এখন সামনে চলে আসছে। অন্যদিকে, এইসব সম্পদের মালিকানা এখন ন্যায়সঙ্গতভাবে কারা দাবি করতে পারে, সেই প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয়।

গণতন্ত্রের ‘ক্রাম্বল’ ও আগামীর বার্তা

লন্ডনের রিটজ হোটেলে গোবর ছিটিয়ে বা রাজকীয় অলঙ্কারে কাস্টার্ড মেখে টিবিপির কর্মীরা যে বার্তা দিয়েছেন তা অত্যন্ত স্পষ্ট, “গণতন্ত্র ভেঙে পড়েছে, ধনীদের ওপর কর আরোপ করে পুরনো হিসাব মেটাতে হবে।” ১৯ বছর বয়সী জাহরা আলী, যিনি প্রদর্শিত রাজকীয় অলঙ্কারের গায়ে খাবার ছুড়েছিলেন, তিনি একে একটি ‘বিপ্লব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি মনে করেন, ঔপনিবেশিক শাসনের সময় যেভাবে সাধারণ মানুষের অধিকার লুণ্ঠন করা হয়েছিল, আজ আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি আর বৈষম্যের মাধ্যমে সেই একই প্রক্রিয়া চলমান।

ঐতিহাসিক লুণ্ঠনের বিচার না হওয়া এবং সেই সম্পদ ফেরত না দেওয়ার একগুঁয়েমিই আজ আধুনিক সমাজে এই ধরনের উগ্র প্রতিবাদের জন্ম দিচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত ঔপনিবেশিক চুরির স্বীকৃতি এবং তার যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া না হবে, ততদিন পর্যন্ত রাজকীয় অলঙ্কারের উজ্জ্বলতা লুণ্ঠনের কলঙ্কেই ম্লান হয়ে থাকবে। রাষ্ট্র যখন নিজেই চুরির পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে নৈতিকতার প্রচার কেবল প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

সমালোচনায় ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

যদিও এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ ছায়া স্বরাষ্ট্র সচিব ক্রিস ফিলিপ। তিনি এই আন্দোলনকে সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ফিলিপ বলেন, “এই গোষ্ঠীটি মূলত অপরাধকে একটি নৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। যখন এই ধরনের নৈরাজ্যবাদীরা চুরি করে, তখন তারা সাধারণ মানুষের জন্য পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। তারা সমাজের কাঠামো নষ্ট করার চেষ্টা করছে।”

তিনি পুলিশকে এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

Translate