সোমবার ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬

চট্টগ্রামে কেজিডিসিএলের গণশুনানিতে অভিযোগের পাহাড়

ডা. সৈয়দা ফরহাত আক্তার। বয়স ৭০ বছরের কাছাকাছি। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। তার অভিযোগ করোনার সময় আর্থিক সংকটে পড়লে ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তারা তার আবাসিক গ্যাস সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করেন। তিনি ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর পুন:সংযোগের জন্য আবেদন করেন।

এরপর পরবর্তীতে সার্ভে কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর কেজিডিসিএল বিক্রয়-উত্তর, জোন-২ হতে নথিটি হারিয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি কেজিসিডিএলে ঘুরছেন। পরে অবশ্য নথিটি পাওয়া গেলেও পাঁচ বছর পরও তিনি পুনঃসংযোগ পাননি।

সোমবার সকালে ষোলশহরের কেজিডিসিএলের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে এ অভিযোগ তুলে ধরেন ডা. সৈয়দা ফরহাত আক্তার।

কেজিডিসিএলের গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উন্নত গ্রাহক সেবার লক্ষ্যে এ গণশুনানির আয়োজন করে কেজিডিসিএল।

গণশুনানিতে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিন। গণশুনানিতে শুধু ডা. সৈয়দা ফরহাত আক্তার নন; একাধিক গ্রাহক তুলে ধরেছেন নানা হয়রানি ও দুর্নীতির চিত্র।

গ্রাহকরা অভিযোগ করে বলেছেন, কেজিডিসিএলে গ্রাহক হয়রানি চরমে। একবার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে পুন:সংযোগ পেতে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।

আবার ব্যবসায়িক ক্যাটাগরির গ্রাহকরা অভিযোগ করে বলেন, গ্যাসের মিটার সন্দেহজনক মনে হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ক্যালিব্রেশন করার জন্য পাঠানো হয় মিটার। এ সময় তারা (গ্রাহকরা) ক্ষতিগ্রস্ত হন।

অনেক গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ স্থানান্তর বিষয়ে আবেদন করা হলেও ২০১৬ সালের মন্ত্রণালয়ে একটি নির্দেশনা দোহাই দেওয়া হচ্ছে। আমাদের কাছে নথি রয়েছে ২০২০ সালে একাধিক বাণিজ্যিক সংযোগ স্থানান্তর করা হয়েছে। আবার কয়েকজন গ্রাহক গ্যাস সংযোগের বিভিন্ন সমস্যা তড়িৎ সমাধান করে দেওয়ার জন্য কেজিডিসিএলের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদও জানান।

বয়:বৃদ্ধা গ্রাহক পাথরঘাটা এলাকার বাসিন্দা আকতারুন্নেছা বেগম গণশুনানিতে বলেন, কেজিডিসিএলের আবাসিক গ্রাহক আমার ভাই মোহাম্মদ নাছির খান। তিনি তিনটি দ্বৈত চুলার মালিক। ১৯৯৪ সালের ২০ অক্টোবর আমার মা নুরুন নাহার বেগম আমার ভাইকে হস্তান্তর করে যান। ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি হেবার ঘোষণাপত্র দলিল মূলে ওই তিনটি দ্বৈত চুলার গ্যাস সংযোগসহ আমার কাছে হস্তান্তর করে দখল অর্পণ করেন। এরপর থেকে আমি নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করে আসছি। দীর্ঘদিন ধরে কেজিডিসিএলে ঘুর ঘুর করছি; কিন্তু এখনও পর্যন্ত চুলাগুলো আমার নিজের নামে করতে পারিনি। আমি চাই মৃত্যুর আগে হলেও চুলাগুলো আমার নামে করে যেতে।

খুলশি জাকির হোসেন রোডের পূর্বানী ফুডস অ্যান্ড বেকারির মালিক জহুরুল হক বলেন, আমি আপনাদের একজন বাণিজ্যিক গ্রাহক। নিয়মিত গ্যাস বিলও পরিশোধ করে আসছি। আমি ভাড়াটিয়া হিসেবে দীর্ঘদিন ১৬ নাম্বার বলুয়ার দিঘীর এলাকায় থাকি। বর্তমানে আমার জায়গার মূল মালিকরা জায়গাটি বহুতলা বিল্ডিং নির্মাণ করার জন্য আবাসন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। ফলে আমি ৪৩৭৭/এ, জাকির হোসেন রোড, খুলশী এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠান ভাড়া নিয়েছি। সেই সঙ্গে আমার ব্যবহৃত গ্যাস সংযোগটিও বর্তমান স্থানে বাণিজ্যিক রেস্টুরেন্টে স্থানান্তরের আবেদন করি। নতুন স্থানে একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এবং লোড অপরিবর্তিত রেখে সরঞ্জাম পুনর্বিন্যাস করার আবেদন করেছি কিন্তু কোনো কাজই হচ্ছে না। এখন দোহায় দেওয়া হচ্ছে ২০১৬ সালের একটি নির্দেশনার। অথচ আমার হাতে কাগজ রয়েছে ২০২০ সালে বাণিজ্যিক গ্রাহকের সংযোগ স্থানান্তর করা হয়েছে। ২০১৬ সালের নির্দেশনা জারির পর স্থানান্তর হলে আমার বেলায় কেন হবে না।

নথিতে দেখা যায়, ২০২০ সালের ১২ মার্চ গত ১২ মার্চ ২০২০ তারিখে অনুষ্ঠিত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ১৪৯তম সভায় বাণিজ্যিক সংযোগ স্থানান্তর করা হয়েছে।

কোম্পানি সচিব এজেএম ছালেহ উদ্দিন সারওয়ার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়- ‘গ্যাস সংযোগ স্থানান্তরের জন্য আবেদনকৃত গ্রাহকদের বিদ্যমান গ্যাস সংযোগটি স্থায়ী বিচ্ছিন্নকরণ সাপেক্ষে বাণিজ্যিক গ্রাহক মেসার্স খাজা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট (গ্রাহক সংকেত নং: ১-সি-৭২-০১৮৬) এর গ্যাস সংযোগটি আইপিএল এ্যাটলেন্টা ট্রেড সেন্টার, ২৩/এ, ও.আর নিজাম রোড, গোল পাহাড় চট্টগ্রাম হতে মোহাম্মদ নগর হাউজিং সোসাইটি, আমিন জুট মিলন, বায়েজিদ, চট্টগ্রামে এ স্থানান্তরপূর্বক পুনঃসংযোগ এবং মেসার্স, আজমীর বেকারি এন্ড হোটেলের গ্যাস সংযোগটি ফানী রোড, কুলগাঁও, জালালাবাদ, পাঁচলাইশ চট্টগ্রাম হতে বিহারী কলোনি, ৮ নম্বর ওয়ার্ড, খুলশী, চট্টগ্রামে স্থানান্তরের অনুমোদন প্রদান করা হলো।’

নুরুল আবছার চৌধুরী নামে চট্টগ্রাম চেম্বারের একজন প্রতিনিধি জানান, গ্যাস সংযোগের নামে একজন ঠিকাদার এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২১ লাখ টাকা আদায় করেছেন। এ ঘটনায় কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।

ডা. সৈয়দা ফরহাত আক্তারের অভিযোগের জবাবে কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা বলেন, ফাইল দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংযোগ দেওয়ার নামে ২১ লাখ টাকা ঘুস গ্রহণের অভিযোগের জবাবে কেজিডিসিএলের ডিজিএম (উত্তর) মো. রফিক খান বলেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। তবে বেশ কিছু অভিযোগের জবাব এড়িয়ে গেছেন কর্মকর্তারা।

পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা কৌশল ও রিসোর্সেস মবিলাইজেশন প্রকৌশলী) বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, আমাদের সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে হবে। ৫৮ টাকায় সরকার এলএনজি আমদানি করছে। আমরা গ্রাহককে দিচ্ছি ২৪ টাকায়। এটি সরকার সেক্রিফাইস করছে। এছাড়া গ্রাহক হয়রানি বন্ধ ও শুনানিতে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেন।

Translate