জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন। দেশজুড়ে ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ নামে যার সুখ্যাতি। প্রায় সাড়ে চার দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। আজ (২৩ আগস্ট) এই তারকার জন্মদিন।
জন্মদিন কাটাবেন বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে পারিবারিক আবহে। দিনটিতে কোনও আনুষ্ঠানিকতায় জড়াতে চান না এই শিল্পী। তার ভাষায়, ‘এখন ঘটা করে জন্মদিন পালনের কোনও মানসিকতা নেই। পরিবার, সহকর্মী আর বন্ধুদের শুভেচ্ছা গ্রহণেই দিন পার। এরসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভক্তদের শুভেচ্ছা পাই। ফলে এখন আর আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে এটাতেই সবচেয়ে আনন্দ পাই।১৯৬৫ সালের এই দিনে বেবী নাজনীন পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলেন। তার গাওয়া তুমুল জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘এলোমেলো বাতাসে উড়িয়েছি শাড়ির আঁচল’, ‘লোকে বলে আমার ঘরে নাকি চাঁদ এসেছে’, ‘ঐ রংধনু থেকে কিছু কিছু রং’, ‘ও বন্ধুরে তুই কতদূরে’, ‘মানুষ নিষ্পাপ পৃথিবীতে আসে’, ‘দু’চোখে ঘুম আসে না’, ‘কাল সারারাত ছিল স্বপনেরও রাত’, ‘ও বন্ধু তুমি কই কই রে’, ‘কই গেলা নিঠুর বন্ধুরে’ প্রভৃতি। ২০০৩ সালে শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। সঙ্গে সিজেএফবি-সহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেন।
আধুনিক সংগীতের সর্বাধিক সংখ্যক একক, দ্বৈত ও মিশ্র অডিও অ্যালবামের শিল্পী তিনি। সংগীত জীবনের শুরু থেকেই অডিও মাধ্যম, বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং দেশ-বিদেশের মঞ্চ মাধ্যম মাতিয়ে চলেছেন সমানতালে।দেশ-বিদেশের মঞ্চে নিয়মিত হলেও লম্বা সময় নতুন গানে নেই বেবী নাজনীন। সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলতেই একবুক হতাশা ব্যক্ত করেন এই শিল্পী।
তিনি বলেন, ‘আপনার জানেন, আওয়ামী শাসনামলে দীর্ঘ ১৫/১৬ বছর আমি এই দেশেই থাকতে পারিনি। গান গাইবো কি করে? এই দেশে বার বার আমার পেশাগত কাজকর্ম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। টেলিভিশন, মঞ্চ এই দুই মাধ্যম একজন শিল্পীর গানের প্রধান মাধ্যম। অথচ এই দুই মাধ্যম থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ফলে অনেক গানের কাজ শুরু করেও শেষ করতে পারিনি। পেন্ডিং কাজগুলো আবার শুরু করেছি। শিগগিরই আমার নতুন গান পাবেন শ্রোতারা।লম্বা বিরতির পর দেশে ও গানে ফিরে এসে বেবী নাজনীন দেখতে পান হতাশার চিহ্ন। তিনি বলেন, ‘এখন কি গানের সেই ইন্ডাস্ট্রি আছে? বাংলা গানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুখকর কিছু দেখছি না। অডিও ইন্ডাস্ট্রি নেই, সেই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি নেই। নতুন গান সৃষ্টির এই দুই বড় মাধ্যম এখন অধুনালুপ্ত। কাজেই নতুন নতুন গান এবং নতুন নতুন শিল্পী তৈরি কঠিন হয়ে উঠবে।’
এখন অনেক শিল্পীই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অভাবে নিজেরাই ইউটিউব চ্যানেল খুলে গান প্রকাশের চেষ্টা করছেন। বিষয়টিকে মোটেই সোজা চোখে দেখছেন না অভিজ্ঞ এই শিল্পী। যার ক্যারিয়ারজুড়ে রয়েছে অসংখ্য অডিও অ্যালবাম। যার বেশিরভাগই প্রকাশ হয়েছে সংগীতা থেকে। সেই অভিজ্ঞতার আলকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বেবী নাজনীনের মূল্যায়ন এমন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এভাবে কারও মিউজিক ক্যারিয়ার তৈরি করা খুব বেশি সহজ নয়। অনেকেই নতুন গান প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি একজন শিল্পী নিজ উদ্যোগে গান করেন, মিউজিক ভিডিও করেন। এভাবে দুই-একজনের দুই-চারটা গান হয়ত আসে এবং আসবে, তবে তাতে বাংলা গানের প্রসার আগের মতো হবে না। বর্তমানে গানের বাজারে যেহেতু বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই, আমি মনে করি এক্ষেত্রে সরকারকেই পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসতে হবে। আর তা না হলে বাংলা গানের ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ হবে না। আগের যা আছে তাই রয়ে যাবে।’ফেরা যাক রাজনীতি সম্পর্কে। সংগীতের দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ার পেরিয়ে এই শিল্পী রাজনৈতিক ক্যারিয়ারেও বেশ অগ্রপথিক। তিনি এখন বিএনপি চেয়ারপার্সনের অন্যতম উপদেষ্টা পদে রয়েছেন। সেই প্রেক্ষিতে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেবী নাজনীন বলেন, ‘ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নতুন এক বাংলাদেশ পেয়েছে মানুষ। এই অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা, যারা আহত হয়েছেন তাদের প্রতি সমবেদনা। তাদের এই ত্যাগ স্মরণ করে আমাদের এমন এক বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে যেতে হবে, যেখানে মানুষের প্রতি মানুষ সম্মান রেখে বাঁচতে পারে। দ্রুত একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের সেই স্বপ্ন পূরণ হবে এমটাই প্রত্যাশা আমার।’
তবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তিনি অংশ নিচ্ছেন কি না। সে বিষয়ে কোনও উত্তর দেননি বার্থ ডে গার্ল। হাসলেন অস্ফুট স্বরে।
বলা দরকার, টানা ৮ বছর পর গত বছরের ১০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরছেন ‘উত্তরবঙ্গের দোয়েল’খ্যাত এই শিল্পী।