শনিবার ২৫শে এপ্রিল, ২০২৬

সীমান্ত সংঘাত নিয়ে মালয়েশিয়ায় আলোচনায় বসছে থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘাত নিরসনে সোমবার মালয়েশিয়ায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। গত কয়েকদিন ধরে দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন করে গোলাবর্ষণের অভিযোগ আনলেও মধ্যস্থতাকারী মালয়েশিয়ার প্রস্তাবনায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। থাইল্যান্ড সরকার এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

মালয়েশিয়ার স্থানীয় সময় সোমবার বিকাল ৩টায় আলোচনা শুরু হবে। থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম উইচাইচাইয়ের নেতৃত্বে দেশটির আলোচক দল বৈঠকে অংশ নেবে। আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের চেয়ারপারসন মালয়েশিয়া থাইল্যান্ড সরকারকে জানিয়েছে যে, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেটও আলোচনায় যোগ দেবেন।

গত মে মাসের শেষদিকে এক সংক্ষিপ্ত সীমান্ত সংঘর্ষে কম্বোডিয়ার একজন নিহত হওয়ার পর থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়। এরপর উভয় পক্ষ সীমান্তে সেনা সমাবেশ বাড়ায় এবং কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়। যা থাইল্যান্ডের নাজুক জোট সরকারকে ভাঙনের কিনারায় নিয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হয় এবং মাত্র চার দিনের মধ্যে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধে রূপ নেয়। এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩০ ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে থাইল্যান্ডে ১৩ ও কম্বোডিয়ায় ৮ জন বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া সীমান্ত এলাকা থেকে ২ লাখের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন যে, দুই নেতা যুদ্ধবিরতিতে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন।

ব্যাংকক ও নম পেন উভয়েই গত সপ্তাহের সংঘাতের জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে। কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, থাইল্যান্ড রবিবার সকালে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে গোলাবর্ষণ ও স্থল আক্রমণ চালিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, ঐতিহাসিক মন্দির কমপ্লেক্সে ভারী আর্টিলারি গোলাবর্ষণ করা হয়েছে।

নম পেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী স্রেউং নিতা রয়টার্সকে বলেছেন, আমার মনে হয়, থাইল্যান্ড যদি যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি হয়, তাহলে দুটি দেশই শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।

অন্যদিকে, থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী বলেছে, কম্বোডিয়ার বাহিনী রবিবার বেশ কয়েকটি এলাকায় বেসামরিক বসতির কাছাকাছি গুলিবর্ষণ করেছে এবং দূরপাল্লার রকেট লঞ্চার মোতায়েন করছে। সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এখনও উত্তপ্ত এবং আলোচনার আগে সর্বোচ্চ ক্ষতি করার জন্য কম্বোডিয়ার সেনাবাহিনী ব্যাপক সামরিক অপারেশনের প্রস্তুতি নিতে পারে।

থাইল্যান্ডের সিসাকেট প্রদেশে রয়টার্সের সাংবাদিকরা রবিবার সারাদিন গোলাবর্ষণের শব্দ শুনেছেন। তবে তা সীমান্তের কোন পক্ষ থেকে হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। সীমান্ত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে একটি সরকারি স্বাস্থ্য ক্লিনিকের জানালা ভেঙে গেছে, দেয়াল ধসে পড়েছে এবং বৈদ্যুতিক তার বেরিয়ে আছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার আর্টিলারি হামলায় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সিসাকেটের বাসিন্দা থাওর্ন টুসাওয়ান রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে জোর দিচ্ছে, এটি ভালো খবর, কারণ এতে শান্তি ফিরে আসবে।

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া তাদের ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিতর্কিত অংশ নিয়ে দশকের পর দশক ধরে বিবাদে জড়িয়ে আছে। প্রাচীন হিন্দু মন্দির তা মোয়ান থম ও ১১শ শতকের প্রিয়াহ ভিহিয়ার মালিকানা এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক আদালত প্রিয়াহ ভিহিয়ার মালিকানা কম্বোডিয়াকে দিলেও ২০০৮ সালে কম্বোডিয়া এটিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি খারাপ হয়। পরের কয়েক বছরের সংঘর্ষে অন্তত এক ডজন মানুষ নিহত হয়।

গত জুনে কম্বোডিয়া জানায়, তারা থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। তবে ব্যাংকক বলেছে, তারা আদালতের এখতিয়ার কখনও স্বীকার করেনি এবং দ্বিপক্ষীয় সমাধান পছন্দ করে।

Translate